টেকনাফে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার ৫৬ জিম্মি, থানায় হস্তান্তর
কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করেছে যৌথ বাহিনী। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে তাঁদের টেকনাফ মডেল থানায় নেওয়া হয়। পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের পর তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানায় অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশ এ অভিযানে অংশ নেয়।
অভিযানে নিহত সেনাসদস্য, আটক পাঁচ পাচারকারী
অভিযানের সময় সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি হয়। এ সময় পাচারকারীদের গুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
৫৭ নয়, প্রকৃত জিম্মি ৫৬ জন
অভিযানের পর প্রথমে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন বলে শনাক্ত হয়। ফলে প্রকৃত জিম্মির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬ জনে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের নাম-পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায়ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
আট দিন ধরে পাহাড়ে বন্দি ছিলেন ভুক্তভোগীরা
উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কক্সবাজারে একটি সেতুর কাজে যুক্ত থাকার সময় উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ভালো কাজের প্রস্তাব দিয়ে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ে নেওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা টাকা কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে একটি ঝুপড়িতে আটকে রাখা হয়। সেখানে আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পান তিনি।
তিনি জানান, দুবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রতিবারই তাঁকে মারধর করা হয়। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি পাহারা দিতেন। সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারে তোলার প্রস্তুতি চলছিল তাঁদের। ঠিক সেই সময় যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।
এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ
উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর অভিযোগ করেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাঁদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন।
পরে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচজন নতুন মানুষকে ওই আস্তানায় নিয়ে আসা হতো। কেউ প্রতিবাদ করলে বা পালানোর চেষ্টা করলে নির্যাতন করা হতো। একপর্যায়ে তাঁদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি স্থানীয়দের
সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে দুর্গম পাহাড়জুড়ে সমন্বিত অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের সক্রিয়তা বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ এসব অপরাধী চক্রের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধার ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফেরানোর প্রক্রিয়া
উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনের পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে। তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অন্য মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের আস্তানা শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় মানব পাচারকারী চক্রের এমন তৎপরতা বন্ধে নিরাপত্তা জোরদার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।




