বিচার বিভাগে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন বা বিধিমালা হয়নি। ফলে প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও এখনো তৈরি হয়নি। 

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের বিচারক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি তিন বছর অন্তর সম্পদের বিবরণী দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাব ছিল, এসব তথ্য সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। 

কমিশনটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক আপিল বিভাগের বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান। ৩৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জবাবদিহি, নিয়োগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ একাধিক প্রস্তাবের মধ্যে সম্পদ বিবরণী প্রকাশের বিষয়টিও রাখা হয়েছিল। 

কিন্তু দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। একই কারণে এসব বিবরণী সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশেরও কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। 

অন্যদিকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর আওতায় তারা নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পদের বিবরণী জমা দেন। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট কমিটির কাছে এই হিসাব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে আদালত সূত্র। 

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্পদ প্রকাশের উদ্যোগ বাংলাদেশে একেবারে নতুন নয়। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নিজের সম্পদের হিসাব তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছে জমা দিয়েছিলেন। এরপর অন্য বিচারকদেরও একই পথে আসার উদ্যোগ দেখা গেলেও নির্দিষ্ট আইন বা বিধি না থাকায় সেই চর্চা স্থায়ী হয়নি। 

আইনজীবী ও বিচারব্যবস্থা সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিচারকদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এর আগে বলেছেন, বিচারপতি ও আদালতের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলে দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। তার মতে, সব পর্যায়ের বিচারকদের জন্য এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রয়োজন। 

বিষয়টি এমন সময়ে আবার আলোচনায় এসেছে, যখন বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিভিন্ন সময়ে তিন হাইকোর্ট বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। 

একই সঙ্গে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের আরও বেশ কিছু বড় সুপারিশও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ও নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে কমিশনের বহু প্রস্তাব অগ্রগতিহীন অবস্থায় রয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিভিন্ন প্রশাসনিক আদেশ, নিয়োগ, বদলি ও আদালত পরিচালনাসংক্রান্ত নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও বিচারকদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের কোনো পৃথক বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার তথ্য সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না। 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভারসাম্য রক্ষা করাই এখানে মূল বিষয়। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সম্পদের বিবরণী কে গ্রহণ করবে, কোন তথ্য জনসমক্ষে থাকবে এবং কত সময় পরপর তা হালনাগাদ হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করে আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

এখন পর্যন্ত সেই কাঠামো তৈরি না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্পদ প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে সংস্কার কমিশনের সুপারিশটি বাস্তবায়নের জন্য নতুন আইন, বিধিমালা বা আনুষ্ঠানিক নীতিমালা প্রয়োজন হবে—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।