ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দির চাপে রয়েছে বাংলাদেশের কারাগারগুলো। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দি ছিলেন ১ লাখ ৩০ হাজার ১২৮ জন। অথচ এসব কারাগারের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার প্রায় ২ দশমিক ৮৮ গুণ বন্দি অবস্থান করছেন কারাগারগুলোতে।

১৭ অক্টোবর প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে কারাগারের এই পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় দেড় লাখ মানুষসহ মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জনে। ওই সময়কালে দৈনিক গড় গ্রেপ্তার ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৫০ জন।

রাজধানীতেও গ্রেপ্তারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে ৫ হাজার ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে মামলা হয়েছে ৫৮০টি। রাজধানীতে ওই ১১ দিনে দৈনিক গড় গ্রেপ্তার ছিল ৪৫৫ জন।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি, কারাগারে পাঠানো ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা বন্দির সংখ্যা এক নয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেউ জামিন পেতে পারেন, আবার কাউকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে। ফলে দৈনিক গ্রেপ্তারের হিসাবকে সরাসরি নতুন কারাবন্দির সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

কারাগারে অতিরিক্ত চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যাও। কারা অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছে, ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে ৭৫ হাজারের বেশি ছিলেন বিচারাধীন। অর্থাৎ তাঁদের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া তখনো শেষ হয়নি।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেকের ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ পরিচালিত ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের সেপ্টেম্বরের হিসাবে, বাংলাদেশের কারাগারে প্রতি ১০০ জনের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করছিলেন প্রায় ২২৬ জন। অক্টোবরের কারা অধিদপ্তরের হিসাবে বন্দির সংখ্যা আরও বেড়েছে।

অতিরিক্ত বন্দির কারণে আবাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৫৪টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই। চিকিৎসকের অনুমোদিত ১৫১টি পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্যও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে।

কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বন্দির কারণে দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনে চাপ বাড়ছে। চিকিৎসাসংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। যথাযথ তদন্ত, দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আইন অনুযায়ী জামিনের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ন্যূনতম আবাসন, চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।