বাংলাদেশে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগকে ঘিরে আইন অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পেশার মান, দক্ষতা ও মর্যাদা বাড়াতে বয়সসীমা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে, এ ধরনের শর্তের কারণে জীবনের পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় আসতে আগ্রহী ব্যক্তিরা সুযোগ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

গত ১৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের আইন পেশায় নতুন করে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির সুপারিশের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার কাউন্সিলের ১৯ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীর একটি অনুলিপিতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদনের তথ্য রয়েছে। নথিতে প্রস্তাবিত বয়সসীমা ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে ৬ আগস্ট লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির বৈঠকে বয়সসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। কমিটির যুক্তি ছিল, একটি যৌক্তিক সর্বোচ্চ বয়সসীমা থাকলে আইন পেশায় দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং পেশাগত দক্ষতা ও মর্যাদা ধরে রাখা সহজ হবে।

তবে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অবস্থান নিয়ে বার কাউন্সিলের নেতৃত্বের মধ্যেই ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বলেছেন, এ বিষয়ে বার কাউন্সিল কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। নতুন আইন বা বিধি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটিকে বিদ্যমান বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বর্তমানে বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরীক্ষার শর্ত পূরণ করতে হয়। বিদ্যমান বিধানে সর্বোচ্চ বয়সসীমার উল্লেখ নেই।

প্রস্তাবটির বিরোধিতাকারীরা বলছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সেশনজট ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত কারণে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগে। আবার কেউ অন্য পেশায় কাজ করার পর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে আইনজীবী হতে চান। বয়সসীমা কার্যকর হলে তাঁদের একটি অংশ সুযোগ হারাতে পারেন।

ঢাকার অধস্তন আদালতের শিক্ষানবিশ আইনজীবী ইমাম হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, সেশনজটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর বয়স এমনিতেই বেড়ে যায়। সরকারি চাকরির চেষ্টা শেষে কেউ আইন পেশায় আসতে চাইলে বয়সের কারণে তাঁকে বাদ দেওয়া যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন তিনি। প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন এই শিক্ষানবিশ আইনজীবী।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী প্রস্তাবটিকে সময়োপযোগী বলে মনে করেন। তাঁর মতে, আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, বসার জায়গা, গবেষণা ও গ্রন্থাগার সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ১৮ হাজার, ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে প্রায় ৪০ হাজার এবং সারা দেশে আনুমানিক ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। তবে আইন পেশা স্বাধীন পেশা হওয়ায় বয়সসীমা আরোপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মঞ্জিলা ঝুমা মনে করেন, কেবল বয়স নির্ধারণ করে আইন পেশার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য মেধাভিত্তিক বাছাই, বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, নবীন আইনজীবীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দক্ষতার নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

তাঁর মতে, বয়সসীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনজীবী, বার কাউন্সিল, আইনশিক্ষকসহ বিচারব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করা উচিত। তরুণ মেধাবীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি যাঁরা বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতির কারণে পরে আইন পেশায় আসতে চান, তাঁদের প্রতিও ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনায় এখন দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি হলো আইন পেশায় প্রবেশের মান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা, অন্যটি হলো বয়সের কারণে যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ সীমিত না করা।

সংশ্লিষ্টদের ভিন্ন অবস্থানের কারণে ৩৫ বছর বয়সসীমা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়মের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং ইতিমধ্যে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন এমন শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা থাকবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন আইন অঙ্গনের অনেকে।