বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি সুন্দরী গাছের একটি বড় অংশ আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছে এই রোগের লক্ষণ রয়েছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক গাছ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।

২০২৪–২৫ সালে সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র নিয়ে দুই বছরব্যাপী গবেষণাটি পরিচালনা করে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে প্রায় ৩৩ কোটি সুন্দরী গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার। গত ১০ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।

আগামরা রোগে প্রথমে সুন্দরী গাছের পাতা আক্রান্ত হয়। পরে ডালপালা শুকিয়ে যেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে মূল কাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুতর অবস্থায় গাছটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতে পারে।

গবেষণায় সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্টাম, কাগা দোবেকি ও গেওয়াখালী এলাকায় এই রোগের প্রকোপ বেশি পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরা, চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের কয়েকটি এলাকাও আক্রান্ত বলে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন এবং জলবায়ুগত চাপ সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আগামরা রোগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণকে এখনো চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যায়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও রোগটির সম্ভাব্য ছত্রাকজনিত কারণ নিয়ে কাজ করছেন। চলতি বছরের মে মাসে আয়োজিত এক সেমিনারে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের কারণ শনাক্ত এবং কার্যকর প্রতিকার উদ্ভাবনে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

এদিকে সুন্দরবনে প্রাকৃতিকভাবে নতুন গাছ জন্মানোর হারও কমেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্ব ছিল ২ হাজার ৬৮৯টি, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৭৬টিতে। এতে বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গবেষণায় গত তিন দশকে সুন্দরবনের ভূ-উপরিস্থ জৈবভর প্রায় ১৫ শতাংশ কমার তথ্যও উঠে এসেছে। এই পরিবর্তন বনের কার্বন সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামরা রোগ সুন্দরবনের দীর্ঘদিনের সমস্যা। অতীতে আক্রান্ত গাছ কেটে রোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও সেই পদ্ধতি কার্যকর হয়নি।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরী গাছের সংখ্যা ও স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রজাতির পরিবর্তে অন্য গাছের বিস্তার ঘটলে বনাঞ্চলের গঠন এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থলেও পরিবর্তন আসতে পারে।