পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম জাতীয় ইয়ুথ নিউক্লিয়ার সংলাপে অংশ নিয়ে পারমাণবিক শক্তি খাতে কাজের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তরুণ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা। তবে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বিশেষায়িত শিক্ষা, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং ইন্টার্নশিপ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দেশের পারমাণবিক খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তরুণদের জন্য পরিকল্পিত প্রস্তুতি জরুরি।

ঈশ্বরদীর নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইয়ুথ নিউক্লিয়ার ডায়ালগ: ইমপ্যাক্ট টিম ২০৫০’ শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী ও স্নাতক অংশ নেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম এবং আন্তর্জাতিক যুব উপদেষ্টা পরিষদ ইমপ্যাক্ট টিম ২০৫০ যৌথভাবে আয়োজন করে।

সংলাপে বাংলাদেশের পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা জানান, পারমাণবিক শক্তি খাতে কাজের আগ্রহ থাকলেও এ বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ এখনো সীমিত।

তরুণেরা মনে করেন, শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা দিয়ে এ খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। আধুনিক গবেষণাগার, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, বৃত্তি, গবেষণা অনুদান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

পারমাণবিক নিরাপত্তা, বিকিরণ, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও মানুষের মধ্যে নানা উদ্বেগ ও ভুল ধারণা রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে। এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর প্রস্তাব দেন অংশগ্রহণকারীরা।

তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে নিউক্লিয়ার ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ, ইয়ুথ ফেলোশিপ, গবেষণা প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নিউক্লিয়ার ক্লাব এবং নিউক্লিয়ার অ্যাম্বাসেডর কর্মসূচি চালুর সুপারিশও করা হয়। তাঁদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরির পাশাপাশি গবেষণা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা।

প্রকল্পের কাজ কমিশনিং ও পরিচালন প্রস্তুতির পর্যায়ে পৌঁছানোয় দক্ষ বাংলাদেশি প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও কারিগরি কর্মী তৈরির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরকে প্রাথমিক পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে নেওয়ার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে আরও কয়েকটি পরীক্ষা ও অনুমোদনের ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৩৩৬ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রকল্প এলাকায় পূর্ণাঙ্গ সিমুলেটরসহ প্রশিক্ষণকেন্দ্রও রয়েছে। পাশাপাশি দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রম চলছে।

তবে প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট জনবল প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বৃহত্তর তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিকিরণ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো রসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ ৩১-এও এসব প্রস্তাব তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতির সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ গড়ে তুলতে শিক্ষা, গবেষণা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। ঈশ্বরদীর এই সংলাপে তরুণদের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করবে দেশের পারমাণবিক খাতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের বড় একটি অংশ।