সবুজ আভাযুক্ত শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান, রঙের রহস্যে নতুন সূত্র
মহাকাশে নক্ষত্রের রং বলতে সাধারণত সাদা, নীল, হলুদ কিংবা লাল আভাকেই বোঝানো হয়। কিন্তু শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে সবুজ, গোলাপি, বেগুনি ও অন্যান্য অপ্রত্যাশিত রঙের ব্যাখ্যা পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় WD J1330+6435 নামের একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের সবুজাভ আভা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
১৫১টি শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলোক-বর্ণালি বিশ্লেষণ করে এই বৈচিত্র্যের সন্ধান পান গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে RAS Techniques and Instruments সাময়িকীতে। গবেষণায় দেখা গেছে, নক্ষত্রের তাপমাত্রার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠনও তার দৃশ্যমান রং নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কীভাবে সবুজাভ দেখায় শ্বেত বামন
WD J1330+6435 নামের শ্বেত বামন নক্ষত্রটির সবুজাভ রঙের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এর বায়ুমণ্ডলে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও লিথিয়ামের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে এনেছেন। গবেষকদের ধারণা, নক্ষত্রটির আগের গ্রহীয় ব্যবস্থার পাথুরে ধ্বংসাবশেষ এর বাইরের স্তরে জমা হওয়ায় এসব মৌলের পরিমাণ বেড়েছে।
সাধারণ অবস্থায় সোডিয়াম আলোর নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। কিন্তু শ্বেত বামনের অত্যন্ত ঘন পরিবেশে সোডিয়ামের পরমাণু ও আশপাশের হিলিয়ামের মিথস্ক্রিয়ায় আলোর শোষণপ্রক্রিয়া বদলে যায়। ফলে কমলা ও লাল রঙের আলোর বড় অংশ শোষিত হয় এবং বাকি আলোর সমন্বয়ে নক্ষত্রটি সবুজাভ বা চার্ট্রুজ রঙের দেখাতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের জ্যোতির্পদার্থবিদ মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে এই বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের নক্ষত্রের রং শুধু তাপমাত্রা দিয়ে বোঝা যায় না; বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদানও আলোর চেহারা বদলে দিতে পারে।
শ্বেত বামন আসলে কী
শ্বেত বামন হলো সূর্যের মতো কম বা মাঝারি ভরের নক্ষত্রের বিবর্তনের শেষ পর্যায়ের অবশিষ্ট কেন্দ্র। নক্ষত্রের কেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে বাইরের স্তরগুলো ছড়িয়ে পড়ে এবং ভেতরের কেন্দ্রটি অত্যন্ত ঘন অবশিষ্ট বস্তু হিসেবে থেকে যায়।
আকারে ছোট হলেও শ্বেত বামনের ঘনত্ব অনেক বেশি। অধিকাংশ শ্বেত বামন সাদা বা নীলাভ সাদা আলো বিকিরণ করে। তবে তাদের বায়ুমণ্ডলে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, কার্বন কিংবা গ্রহীয় ধ্বংসাবশেষ থেকে আসা বিভিন্ন মৌলের উপস্থিতি আলোর বর্ণালিতে ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণেই শ্বেত বামনের রং নিয়ে গবেষণা নক্ষত্রের গঠন ও বিবর্তন বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
গোলাপি আভার নক্ষত্রও নজরে
গবেষণায় WD J1011+2845 নামের আরেকটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের অস্বাভাবিক গোলাপি আভাও উঠে এসেছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৮ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই নক্ষত্রটির আলোতে কার্বনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
নক্ষত্রটির গভীর পরিচলন অঞ্চলের মাধ্যমে ভেতরের কার্বন বাইরের স্তরে উঠে আসতে পারে। সেখানে কার্বন অণু আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে বর্ণালির ভারসাম্য বদলে দেয়। এর ফলে নক্ষত্রটির আলো স্যামন বা গোলাপি আভাযুক্ত দেখাতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলোতে বেগুনি, হলুদ, সায়ান কিংবা হালকা নীল আভা তৈরি হতে পারে। কোন নক্ষত্রে কী ধরনের রং দেখা যাবে, তা তার তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের উপাদান এবং সেসব উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।
নক্ষত্রের রং নির্ধারণে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা
নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তার রাসায়নিক গঠন, তাপমাত্রা এবং বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে ধারণা পান। বিশেষ করে শ্বেত বামনের বাইরের স্তরে ভারী মৌলের উপস্থিতি থেকে জানা যেতে পারে, অতীতে তার আশপাশে গ্রহাণু বা গ্রহীয় ধ্বংসাবশেষ ছিল কি না।
এ গবেষণায় নক্ষত্রের আলোক-বর্ণালি এবং তার ভিত্তিতে তৈরি মডেল ব্যবহার করে মানুষের চোখে সম্ভাব্য রং কেমন দেখাতে পারে, তা হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, সবুজাভ আভা শনাক্ত করার বিষয়টি সরাসরি দূরবীক্ষণযন্ত্রে নক্ষত্রটিকে সবুজ গোলক হিসেবে দেখার সমতুল্য নয়; বরং আলো বিশ্লেষণ করে তার রং সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, অধিকাংশ শ্বেত বামন এখনো সাদা রঙের কাছাকাছি দেখায়। তবে ব্যতিক্রমী রঙের এই নক্ষত্রগুলো দেখাচ্ছে, নক্ষত্রের আলো ও রাসায়নিক গঠনের সম্পর্ক ধারণার চেয়ে বেশি জটিল।
মহাকাশে এমন রঙের বৈচিত্র্য শনাক্ত করা শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে মৃত নক্ষত্রের বিবর্তন, তাদের গ্রহীয় ব্যবস্থার অতীত এবং নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে মৌলের আচরণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

