ফেলে দেওয়া বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকেরা। মানববর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন শোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে বায়োক্রুড বা অপরিশোধিত জৈব তেল তৈরির এ গবেষণায় পরীক্ষাগারে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ উৎপাদন হার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। প্রযুক্তিটি এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

১০ অক্টোবর শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গবেষক দলটি প্রযুক্তিটির অগ্রগতি তুলে ধরে। কুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে দলটি প্রধানমন্ত্রীকে গবেষণার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বিজ্ঞপ্তির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে একাধিক সংবাদমাধ্যম।

কীভাবে বর্জ্য থেকে তেল তৈরি হবে

গবেষণায় ব্যবহৃত প্রযুক্তিটির নাম হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন (এইচটিএল)। এ পদ্ধতিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানির উপস্থিতিতে জৈব বর্জ্যকে তরল জ্বালানির কাঁচামালে রূপান্তর করা হয়। বিশেষ করে আর্দ্র বর্জ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ প্রচলিত কিছু পদ্ধতির মতো বর্জ্যকে আগে পুরোপুরি শুকানোর প্রয়োজন হয় না।

প্রক্রিয়াটিতে উৎপাদিত বায়োক্রুড সরাসরি প্রচলিত ডিজেল বা পেট্রোলের সমতুল্য নয়। ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগাতে এর গুণমান, রাসায়নিক গঠন এবং পরিশোধনের প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা করতে হয়। কুয়েটের গবেষকেরা বায়োক্রুডে ডিজেলসমৃদ্ধ উপাদান তৈরির ক্ষেত্রেও অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।

পরীক্ষাগারে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ উৎপাদন

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় ব্যবহৃত বর্জ্যের বিপরীতে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ বায়োক্রুড উৎপাদনের হার পাওয়া গেছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফলই বড় কারখানায় একই হারে উৎপাদন নিশ্চিত করে না। বর্জ্যের ধরন ও গঠন, প্রক্রিয়াকরণের শক্তি খরচ, উৎপাদিত তেলের মান এবং বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের পর অবশিষ্ট উপাদান ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

কুয়েটের গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রেও মানববর্জ্যজাত কাদা ও জৈব কঠিন বর্জ্য থেকে বায়োক্রুড উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় তাপ প্রয়োগের ধাপ পরিবর্তন করে উৎপাদনের হার ও তেলের গুণমান উন্নত করার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়েছে।

পরবর্তী লক্ষ্য পরীক্ষামূলক কারখানা

গবেষণাটিকে পরীক্ষাগারের বাইরে নিয়ে যেতে প্রতিদিন এক থেকে তিন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম একটি পরীক্ষামূলক কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা।

এ পর্যায়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। পরীক্ষামূলক কারখানায় সফলভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা যাবে। তবে কারখানা স্থাপন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

আমদানি নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বিকল্প তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের প্রাক্কলনে এতে বছরে ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।

তবে এ হিসাব এখনো বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবে কতটা তেল উৎপাদন করা যাবে, উৎপাদিত তেল কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার ব্যয় কত পড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষামূলক পর্যায়ের ফলাফল থেকেই পাওয়া সম্ভব হবে।

পরিবেশ সুরক্ষায়ও সম্ভাবনা

জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি এ প্রযুক্তি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে। মানববর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের একটি অংশ জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশগত সুফল কতটা হবে, তা নির্ভর করবে প্রক্রিয়াটির শক্তি ব্যবহার, নির্গমন এবং অবশিষ্ট বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গবেষণাটি এগিয়ে নিতে সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে। বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

কুয়েটের এ গবেষণা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরছে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের ফলাফল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করাই হবে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।