মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের কথা জানিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, পরীক্ষাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন কুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

২০১৬ সাল থেকে অধ্যাপক খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের গবেষক দল এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন বা এইচটিএল পদ্ধতি।

এই প্রযুক্তিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ প্রয়োগ করে ভেজা জৈব বর্জ্যকে তেলের মতো পদার্থে রূপান্তর করা হয়। ফলে জ্বালানি তৈরির আগে বর্জ্য সম্পূর্ণ শুকানোর প্রয়োজন হয় না।

গবেষণার শুরুর দিকে মানববর্জ্য ও পয়ঃশোধনাগারের কাদা থেকে পেট্রল ও অকটেনের উপাদানসমৃদ্ধ বায়োক্রুড তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতা বিবেচনায় ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনের দিকে গবেষণার লক্ষ্য পরিবর্তন করা হয়।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ধানের তুষ ও কাঠের গুঁড়ার মতো কৃষিজ উপাদানের সঙ্গে জৈব বর্জ্য মিশিয়ে জ্বালানি উৎপাদনের পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। এতে ডিজেল তৈরির উপযোগী উপাদানসমৃদ্ধ বায়োক্রুড পাওয়া গেছে।

তবে পরীক্ষাগারে ৫০–৫৫ শতাংশ বায়োক্রুড উৎপাদনের অর্থ এই নয় যে সমপরিমাণ সরাসরি ব্যবহারযোগ্য ডিজেল উৎপাদিত হয়েছে। বায়োক্রুড থেকে প্রচলিত মানের জ্বালানি তৈরি করতে আরও পরিশোধন ও মান যাচাই প্রয়োজন।

গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন এক থেকে তিন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির উৎপাদনক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।

গবেষক দলের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হলে ভবিষ্যতে দেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের একটি অংশের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তাঁরা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

তবে এসব হিসাব এখনো গবেষকদের পূর্বাভাস। বাস্তবে কতটা জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে এবং উৎপাদন খরচ প্রতিযোগিতামূলক হবে কি না, তা পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পয়ঃবর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এ প্রক্রিয়ার পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে উৎপাদনে ব্যবহৃত শক্তি, পানি, রাসায়নিক উপাদান এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পর অবশিষ্ট বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে গবেষণাটি উপস্থাপনের সময় কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সরকার প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর কোনো নিশ্চিত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।

কুয়েটের এই গবেষণা দেশের বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তি উন্নয়নে একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে গবেষণাগারের সাফল্যকে বাস্তব শিল্প উৎপাদনে রূপ দিতে আরও পরীক্ষা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে এর সক্ষমতা এখনো প্রমাণের অপেক্ষায়।