বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত ঘুরে দাঁড়ানো এখনো দেখা যায়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ Bangladesh Development Update-এ বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম বিনিয়োগ ও দুর্বল রাজস্ব আহরণ অর্থনীতির গতি আটকে রাখছে।

এটি বিশ্বব্যাংকের আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বড় ধরনের সংশোধন। এপ্রিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশ হবে বলে ধারণা করেছিল সংস্থাটি। নতুন হিসাবে তা ১.২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৩.৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৫.৮ শতাংশ। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ টানা কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধির গতি কমছে।

বিনিয়োগে ধাক্কাই বড় কারণ

বিশ্বব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি কমার পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪.৮ শতাংশ।

উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসার খরচ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও এর সুফল এখনো বেসরকারি বিনিয়োগে দৃশ্যমান হয়নি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে কারখানাগুলো অনেক সময় সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগের পুনরুদ্ধার আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে ব্যাংক খাতকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৩.২ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২০.২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে এই হার ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে।

এদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে যায় ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম মান যেখানে ১০ শতাংশ, সেখানে এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর লোকসান সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শুধু আর্থিক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ঋণপ্রবাহ কমে গেলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও সংকুচিত হয়। বিশ্বব্যাংক তাই প্রবৃদ্ধি ফেরাতে ব্যাংক খাতের দ্রুত সংস্কারকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।

জ্বালানি সংকটেও চাপে শিল্প

দেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহের সংকটও বড় বাধা হয়ে উঠেছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহের ঝুঁকি বাংলাদেশের শিল্প ও সরকারি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট বেসরকারি বিনিয়োগের পুনরুদ্ধারকে আরও বিলম্বিত করতে পারে।

রাজস্ব আয় কম, মূল্যস্ফীতির চাপও রয়ে গেছে

অর্থনীতির আরেকটি কাঠামোগত দুর্বলতা হলো সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির প্রায় ৮.৩ শতাংশে ছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবে খুবই কম। এর ফলে অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে সরকারের ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতিও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

বাড়ছে দারিদ্র্য, থমকে কর্মসংস্থান

প্রবৃদ্ধির মন্থরতার সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনে ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার ১.১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০.১ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ, এক বছরে আনুমানিক ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ ছিল; সর্বশেষ হিসাবে তা ২২.৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থাকলেও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ এর আওতার বাইরে রয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

দ্রুত সংস্কারের আহ্বান

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংক খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করা, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক ভর্তুকির বদলে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে পুরো চিত্রে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে তার প্রতিফলন এখনো যথেষ্ট নয়।

বিশ্বব্যাংক ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে সেই পুনরুদ্ধার কতটা দ্রুত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ব্যাংক খাতের সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ কত দ্রুত উন্নত করা যায় তার ওপর।