রেলওয়ের জমির হিসাবে বড় অমিল, ৬৫৪ একরের ব্যাখ্যা কোথায়

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩ হাজার ২৫ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে বলে রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ ভূমিসংক্রান্ত তথ্যে দখল হওয়া জমির পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে ৩ হাজার ৬৭৮ দশমিক ৮৩ একর। দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ৬৫৩ দশমিক ৯৯ একর। এই ব্যবধানের কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

২৬ অক্টোবর সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে রেলওয়ের জমির নতুন হিসাব তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ৬৩ হাজার ৭২ দশমিক ৯০৯ একর। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৪ দশমিক ৮৪ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগার।

সরকারি দুই হিসাবে কী পার্থক্য

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমি সংক্রান্ত তথ্যাদি’ শীর্ষক পাতাটি ২০২৫ সালের ১ মে হালনাগাদ করা হয়েছিল। সেখানে রেলওয়ের মোট জমি দেখানো হয়েছে ৬১ হাজার ৮৬০ দশমিক ২৮ একর। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৭৮ দশমিক ৮৩ একর জমি অবৈধ দখলে এবং ১৪ হাজার ৪৭৩ দশমিক ২৪ একর জমি ইজারা বা লাইসেন্স দেওয়া রয়েছে।

অন্যদিকে, সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত নতুন হিসাবে রেলওয়ের মোট জমি ৬৩ হাজার ৭২ দশমিক ৯০৯ একর এবং ইজারা দেওয়া জমির পরিমাণ ২৫ হাজার ৮৩ দশমিক ১৩৮৮ একর। অর্থাৎ, শুধু অবৈধ দখলে থাকা জমির হিসাবেই নয়, রেলওয়ের মোট জমি ও ইজারাকৃত জমির পরিমাণেও দুই তথ্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

পুরোনো ও নতুন হিসাবের তুলনায় রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২১৩ একর। ইজারা দেওয়া জমির পরিমাণের পার্থক্য প্রায় ১০ হাজার ৬১০ একর। তবে এই পরিবর্তন জমি নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা, ভূমির শ্রেণিবিন্যাস সংশোধন, নথি হালনাগাদ কিংবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দখল হওয়া জমি উদ্ধারে তিন মাসের পরিকল্পনা

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেলওয়ের বেদখল জমি উদ্ধার এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি রেলওয়ে স্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অব্যবহৃত জমির পরিকল্পিত ব্যবহার এবং অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারের কাজ সহজ হবে। বৈঠকে আরও জানানো হয়, পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগে রেলওয়ের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কমিটি আগামী তিন মাসের মধ্যে বেদখল জমি চিহ্নিত করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের আওতাধীন জেলাগুলোতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে রেলভূমিতে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথাও বৈঠকে জানানো হয়েছে।

ইজারা থেকে আয় ৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা

সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রেলওয়ের ২৫ হাজার ৮৩ একর জমি ইজারা দিয়ে ৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসারে ইজারা বা লাইসেন্সের মাধ্যমে ব্যবহারের উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

তবে ইজারাকৃত জমির পরিমাণ নিয়ে ওয়েবসাইটের পুরোনো হিসাবের সঙ্গে নতুন হিসাবের বড় ব্যবধান থাকায় ভূমির শ্রেণিবিন্যাস ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার তথ্য হালনাগাদ রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই পার্থক্যের নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ভূমিসংক্রান্ত ১ হাজার ৯৯১টি মামলা

সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত তথ্যের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রেলওয়ের ভূমিসংক্রান্ত ১ হাজার ৯৯১টি মামলা চলমান থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জমি নিয়ে এসব মামলার বিস্তারিত তথ্য, কোন এলাকায় কত জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রেলওয়ের জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পদ। এই সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, অবৈধ দখলের অবস্থা, ইজারা এবং রাজস্ব আয়ের হিসাব পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া নতুন তথ্য ও মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা পুরোনো হিসাবের পার্থক্য কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।

মন্ত্রণালয় জমি উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগের কথা জানালেও দুই হিসাবের অমিলের ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে জমির প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ এবং সরকারি নথিতে সমন্বিত তথ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।