রাজধানীর চারটি বার ও প্রতিষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত অভিযান কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়নি বলে জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রিজভী আহম্মেদ। তার দাবি, দাপ্তরিকভাবে পাওয়া নথি ও বিভিন্ন উৎসের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে যেসব প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে, সেখানেই অভিযান চালানো হয়েছে।
শনিবার ৩ অক্টোবর রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। একই দিনে অ্যালকোহলজাত পণ্যের বৈধ উৎস, শুল্ক, মূসক ও আয়কর পরিশোধ এবং অননুমোদিত সরবরাহের অভিযোগ যাচাই করতে চারটি প্রতিষ্ঠানে একযোগে অভিযান চালানো হয়।
রিজভী আহম্মেদ বলেন, অভিযানে থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আলাদা। ফলে কোনো ব্যক্তি, সংঘ বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই অভিযানের মূল বিষয় নয়। এনবিআরের কাছে থাকা নথি এবং বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের পর প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এনবিআরের আওতাধীন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবার প্রথমবারের মতো সমন্বিতভাবে এমন অভিযান চালায়। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর চারটি দল গঠন করে। তাদের সঙ্গে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন।
একটি দল ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডে অভিযান চালায়। সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৩০ বোতল বা পিস লিকার পাওয়া যায়, যার বৈধ কাগজপত্র প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেনি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য একটি কাভার্ডভ্যানে করে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। পরে গাড়িসহ পণ্য জব্দ করা হয়।
একই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশি জিনসেং ও প্রায় এক কেজি জাফরানও পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা জানান, এসব পণ্যের আমদানি বা ক্রয়সংক্রান্ত বৈধ নথি দেখানো যায়নি। জিনসেং আমদানিতে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে। পণ্যগুলো জব্দ করে আমদানি ও বিক্রির নথিপত্র পরীক্ষা শুরু করেছে এনবিআর।
আরেকটি দল উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জে অভিযান চালিয়ে মোট ৬০৮ লিটার লিকারজাতীয় পণ্য পায়। এর মধ্যে ৩৬ লিটার দেশীয় উৎপাদিত বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব পণ্যের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় পুরো চালান জব্দ করা হয়।
তৃতীয় দল তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন ইন্টারন্যাশনালে অভিযান চালায়। সেখানে বারের লাইসেন্স হোটেলটির নিজের নামে নয়, বরং ‘হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে না পারায় সেগুলো সংগ্রহ করে যাচাই করা হচ্ছে।
চতুর্থ দল র’ ক্যানভাস রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে ২৯ লিটার অনুমোদনহীন লিকার জব্দ করে। সব মিলিয়ে চার প্রতিষ্ঠানে ২৩০ বোতল মদ এবং আরও প্রায় ৬৩৭ লিটার অনুমোদনহীন লিকার জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযানগুলোতে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। জব্দ করা পণ্যের মোট বাজারমূল্য, শুল্ক-কর ফাঁকির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নথিপত্র যাচাই শেষে জানানো হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহম্মেদ বলেন, সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিগত আক্রোশের সঙ্গে এই অভিযানকে যুক্ত করার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, এনবিআরের অভিযান নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং আগেও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্বসংক্রান্ত অভিযোগ ও মামলা ছিল।
এনবিআর জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার কয়েকটি বার, রেস্তোরাঁ, কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ফ্রি শপে অবৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্য সংগ্রহ, শুল্ক-মূসক ও আয়কর ফাঁকি এবং অননুমোদিত গ্রাহকের কাছে এসব পণ্য সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সমন্বিত অভিযান শুরু করা হয়েছে।
অভিযান কতদিন চলবে, এমন প্রশ্নে রিজভী আহম্মেদ বলেন, তা নির্ভর করবে প্রয়োজনীয়তার ওপর। বিভিন্ন প্যারামিটার ও তথ্য বিশ্লেষণে কোনো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

