নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সংশোধিত পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে সব বই সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের তুলনায় ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছাপাখানাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবির ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন ও অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তর মিলিয়ে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে মুদ্রণ অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

চলতি বছর প্রাক্‌-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, দাখিল, মাধ্যমিক, ভোকেশনাল ও কারিগরি শিক্ষার জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বইও এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রাথমিক স্তরে অগ্রগতি বেশি, পিছিয়ে মাধ্যমিক

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরের মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তর একসঙ্গে হিসাব করলে বই ছাপার গড় অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশে।

ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি বই ছাপা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের সম্মিলিত অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই নিয়ে বাড়তি তৎপরতা

মাধ্যমিক স্তরের মধ্যে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ নিয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে। এনসিটিবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কয়েকটি ছাপাখানায় এসব শ্রেণির বই মুদ্রণের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। কয়েকটি লটে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করায় কাজ শুরু হতেও দেরি হয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে জানিয়েছেন, কাজের অগ্রগতি কম থাকায় ৩২টি ছাপাখানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে অন্য ছাপাখানাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের ৫০ শতাংশ ৩ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বইয়ের মান যাচাইয়ে ৫৩টি দল

শুধু সময়মতো বই ছাপানো নয়, বইয়ের কাগজ, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের মান নিশ্চিত করতেও তৎপরতা চালাচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত ৫৩টি তদারকি দল দেশের বিভিন্ন ছাপাখানায় বইয়ের মান পরীক্ষা করছে।

এনসিটিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানদণ্ড পূরণ না করায় ৩৬টি ছাপাখানার নিম্নমানের ছাপা ফর্মা ও বই বাতিল করা হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ছাপা ফর্মা এবং প্রায় ১২ হাজার বই বাতিল করা হয়েছে।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই গ্রহণ করা হবে না। বাজারদর যাচাই করে বই ছাপানোর জন্য যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কম দামের অজুহাতে কোনো প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করতে না পারে।

মন্ত্রী আরও বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরও মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ নিয়ে আশাবাদ এনসিটিবির

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাসসকে জানিয়েছেন, নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ এগোচ্ছে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার অগ্রগতি ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন তিনি।

মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ জানিয়েছেন এনসিটিবির এই কর্মকর্তা। তবে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

এবার আগের বছরের তুলনায় এক মাস আগে বই ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীরা যেন সংশোধিত ও মানসম্মত পাঠ্যবই হাতে পায়। সেই লক্ষ্য পূরণে আগামী এক মাসে ছাপাখানাগুলোর কাজের গতি, বইয়ের মান যাচাই এবং উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ কার্যক্রমের ওপর নজর থাকবে এনসিটিবির।