ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উসকানি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নাকচ করেছেন পোশাকশ্রমিকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, বরং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সংসারের ব্যয় মেটাতে না পেরেই তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। মজুরি বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত রাজপথ ছাড়তে চান না তাঁরা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ও রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগ তুলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সংসার চালাতে হিমশিম শ্রমিকদের
মিরপুরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরিতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং যাতায়াত খরচ মেটানোর পর হাতে তেমন টাকা থাকে না।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শ্রমিক বলেন, কে উসকানি দিচ্ছে, আর কে দিচ্ছে না, তা তাঁদের দেখার বিষয় নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারে টান পড়েছে। পেটের দায়েই তাঁরা আন্দোলন করছেন।
শ্রমিক শোয়েব ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা কোনো নাশকতার সঙ্গে জড়িত নন। কেউ নাশকতা করলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে কোনো শ্রমিককে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হলে তাঁরা প্রতিবাদ করবেন।
শেফালী বেগম নামে এক নারী শ্রমিকের বক্তব্য, শুধু আশ্বাস দিয়ে আর তাঁদের কাজে ফেরানো যাবে না। সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে। মজুরি বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেই তাঁরা কাজে ফিরবেন।
শামীম নামে আরেক শ্রমিকের দাবি, সরকার ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার ঘোষণা দিলেই শ্রমিকরা কারখানায় ফিরে যাবেন।
মিরপুর ও গাজীপুরে সংঘর্ষ, সড়কে ভোগান্তি
মঙ্গলবার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কালশী মোড়ে সায়মন নামে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও একই দিন শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ করেন। তাঁদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে দুই মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাসহ বিভিন্ন এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। অবরোধের কারণে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
পুলিশের দাবি, আন্দোলনে ঢুকেছে বহিরাগতরা
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে বহিরাগতদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউ পোশাকশ্রমিক নন।
মঙ্গলবার আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি সেখানে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁদের শনাক্ত করতে পুলিশ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনও অভিযোগ করেছেন, একটি গোষ্ঠী শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে। তাদের অর্থায়ন নিয়েও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদারও আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার বোর্ড গঠন করেছে। এরপরও সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
শ্রমিকনেতাদের বক্তব্যেও ভিন্নতা
আন্দোলনরত শ্রমিকরা রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগ অস্বীকার করলেও শ্রমিকনেতাদের একাংশের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁরা মনে করেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক হলেও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার শ্রমিকদের শান্ত থেকে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। আলোচনার মাধ্যমে বোর্ড একটি যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করবে।
তিনি আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের সুযোগ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তারও একই ধরনের অভিযোগ করে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্য, তাঁদের দাবির সমাধান না করে শুধু কাজে ফেরার আহ্বান জানালে সমস্যার সমাধান হবে না।
মজুরি বোর্ড গঠন, তবু কাটেনি অস্থিরতা
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের মধ্যে ২ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছিল। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে শ্রমিকদের দাবি, বোর্ড গঠন তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের নিশ্চয়তা নয়। তাঁরা মজুরি বৃদ্ধির নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেখতে চান।
উল্লেখ্য, পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন এই মজুরি ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
বর্তমান আন্দোলনে শ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। পাশাপাশি চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালোতালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধের দাবিও রয়েছে।
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর ঘোষণা
শ্রমিকদের বক্তব্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযোগের মধ্যে আন্দোলনের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একদিকে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে সরকার, অন্যদিকে শ্রমিকরা দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি জানাচ্ছেন।
মজুরি বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের অনেকে। তাঁদের বক্তব্য, এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়, বরং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।



