বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মালয়েশিয়াগামী একটি কাঠের বোট থেকে মোট ৭৬ জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। সেন্ট মার্টিন লাইটহাউস থেকে প্রায় ৮১ নটিক্যাল মাইল দূরে ইঞ্জিন ও পাম্প বিকল হয়ে বোটটি বিপজ্জনক অবস্থায় ভাসছিল। দ্রুত অভিযান চালিয়ে সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করে নৌবাহিনী। 

ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার গভীর রাতে। এফভি ক্রিস্টাল-১ নামে একটি মাছ ধরার নৌযান প্রথমে বোটটিকে সমুদ্রে ভাসতে দেখে। সাহায্যের জন্য কাছে গেলে বোটে থাকা কয়েকজনের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তারা নৌবাহিনীকে খবর দেয়। 

সেন্ট মার্টিন এলাকায় নিয়মিত টহলে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। ততক্ষণে বোটটির ইঞ্জিন ও পানি নিষ্কাশনের পাম্প বিকল হয়ে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করেছিল। নৌসদস্যরা দ্রুত পানি অপসারণ করে বোটটিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। 

এরপর বোটে থাকা ৭৬ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার ও প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তাও দেওয়া হয়। 

নৌবাহিনীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৭৬ জনের মধ্যে ১১ জনকে মানবপাচারকারী চক্রের সন্দেহভাজন সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়। বাকি ৬৫ জনকে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার নামে প্রতারণার শিকার বলে জানানো হয়েছিল। 

নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অনেককে পাচারকারী চক্র অপহরণ বা প্রলোভনের মাধ্যমে টেকনাফের দুর্গম এলাকায় আটকে রেখেছিল। পরে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ওই কাঠের বোটে তোলা হয়। 

তবে ঘটনার পরবর্তী পুলিশি তদন্তে সংখ্যায় পরিবর্তন আসে। দ্য ডেইলি স্টারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা হয়েছে। আদালত গ্রেপ্তার ১৩ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। 

সর্বশেষ মামলার নথি অনুযায়ী, পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৬৩ জন। তাদের মধ্যে ১৪ জন রোহিঙ্গা, যাদের চারজন নারী; বাকিরা বাংলাদেশি নাগরিক। এই হালনাগাদ তথ্যটি নৌবাহিনীর প্রাথমিক ৬৫ জন ভুক্তভোগী ও ১১ জন সন্দেহভাজনের হিসাবের চেয়ে আলাদা, কারণ পরবর্তী পুলিশি যাচাইয়ে অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। 

উদ্ধার অভিযানের পর আটক ব্যক্তিদের এবং জব্দ করা কাঠের বোটটি টেকনাফ থানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও উদ্ধার ও আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। 

নৌবাহিনী বলেছে, সময়মতো অভিযান না চালালে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। কারণ ইঞ্জিন ও পাম্প বিকল হওয়ার পর বোটটিতে দ্রুত পানি ঢুকছিল।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী জানিয়েছে, দেশের সমুদ্রসীমায় মানবপাচার, চোরাচালান ও অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। 

সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার নামে টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলকে ব্যবহার করে মানবপাচারের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগের বিষয়। এবারের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পুলিশি তদন্ত মিলিয়ে পাচারচক্রের আরও সদস্য বা সহযোগী আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।