চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে ডেনমার্কের সঙ্গে যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ইনভেস্ট বাংলাদেশ) কার্যালয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারের বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। বৈঠক শেষে ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আলোচনার বিষয়গুলো জানানো হয়।
বৈঠকে চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে একটি যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রকল্প লালদিয়া টার্মিনাল
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া এলাকায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস (APM Terminals) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটিতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৃহৎ একক বিনিয়োগ এটি।
চুক্তি অনুযায়ী, এপিএম টার্মিনালস নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালটির নকশা, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। নির্মাণের জন্য তিন বছর এবং পরিচালনার জন্য ৩০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ প্রকল্পটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
টার্মিনালটি চালু হলে বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউ (TEU) কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কাফকোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা
বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের বৈঠকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কাফকো দেশের অন্যতম বড় সার উৎপাদনকারী যৌথ বিনিয়োগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ, জাপান, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের অংশীদারত্বে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে এর উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়।
বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কাফকোতে নতুন বিনিয়োগ বা মালিকানা পরিবর্তনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য খাতে ডেনিশ বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ডেনমার্কের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি নোয়াখালীর স্বর্ণদ্বীপের সম্ভাবনা নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করেছে।
ডেনমার্ক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে বায়ুশক্তি ব্যবহারে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
এর আগে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে ডেনিশ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কক্সবাজারের কাছে প্রস্তাবিত ৫০০ মেগাওয়াটের অফশোর উইন্ড প্রকল্পও দুই দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানার অব্যবহৃত সম্পদে বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি ও শিল্পসম্পদে বিনিয়োগের জন্য ডেনিশ উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় আগে চিনিকল বা অন্যান্য শিল্পকারখানা ছিল, সেসব স্থানে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা বিদ্যমান অবকাঠামো উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
আগ্রহী ডেনিশ বিনিয়োগকারীরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও সহযোগিতার সুযোগ
বৈঠকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) ড. জুলিয়া মঈন দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
তিনি মৌসুমি কৃষিপণ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্যতা যাচাই, হিমাগার নির্মাণ এবং স্থানীয় ফল থেকে পানীয় ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। এসব পণ্য দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে দুই দেশ
বৈঠকে দুই পক্ষই বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত যৌথ কর্মদল গঠন হলে নির্মাণকাজের অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পায়ন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে ডেনিশ বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগও অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ।
তবে যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কর্মদল গঠনের সময়সূচি জানানো হয়নি।




