বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহ্যগত দাতা-গ্রহীতা সম্পর্কের বাইরে গিয়ে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত Bay of Bengal Conversation 2026-এ দুই পক্ষের প্রতিনিধির বক্তব্যে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
রোববারের আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আরও কৌশলগত ও বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা একটি অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
মিলারের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক এবং উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক করার লক্ষ্য রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও ইউরোপীয় পক্ষ আগ্রহ দেখাচ্ছে। সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও কাজ করার সুযোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ‘Everything But Arms’ বা EBA সুবিধার আওতায় ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রপ্তানি ২১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি হয়েছে বলে ইইউর তথ্য জানিয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ধরে রাখতে নতুন বাণিজ্য কাঠামো, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং GSP Plus—দুই সম্ভাবনাই বিবেচনা করছে।
ইইউর সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামোও এরই মধ্যে বিস্তৃত হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি Partnership and Cooperation Agreement (PCA)-এর খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নেয়। চুক্তিটি কার্যকর হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি, অভিবাসন, নিরাপত্তা, জলবায়ু ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কাঠামো আরও বিস্তৃত হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য রপ্তানি যুক্তরাজ্যের বাজারে Developing Countries Trading Scheme-এর আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এলডিসি উত্তরণের পর তিন বছরের একটি পরিবর্তনকাল থাকবে, এরপর বাংলাদেশ DCTS-এর Enhanced Preferences স্তরে যাবে।
Bay of Bengal Conversation-এর আলোচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু বাজার সুবিধা নয়, বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তির বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসার পরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সম্মেলনের আরেক অধিবেশনে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্য দেশের কোম্পানির তুলনায় সমান আচরণ পাচ্ছে কি না, সেটিকে গুরুত্ব দেবে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এলডিসি উত্তরণ শুধু বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার বিষয় নয়; একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলারও বড় পরীক্ষা। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে নেওয়ার আগ্রহই স্পষ্ট হয়েছে।




