৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানোর কথা মিয়ানমারের—‘প্রত্যাবাসনের নামে নাটক’ বলছেন নেতারা
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তির ঠিক আগে প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন বার্তা দিয়েছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের পাঠানো তালিকা যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকার। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা নেতারা এই ঘোষণায় নতুন আশার বদলে পুরোনো সংশয়ই দেখছেন। তাদের প্রশ্ন—নিরাপত্তা পরিস্থিতি কবে ‘স্বাভাবিক’ হবে, কে সেটি নির্ধারণ করবে এবং দেশে ফিরে রোহিঙ্গারা নাগরিক হিসেবে কী অধিকার পাবেন—এসব মৌলিক বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তাদের কাছে মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম পাঠিয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই শেষে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে তারা কথিত ‘সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রোহিঙ্গা নেতাদের আপত্তির বড় জায়গা এখানেই। United Council of Rohingya Representatives-এর সভাপতি সৈয়দ উল্লাহর মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথ আরও জটিল হয়। পরিবারের একজন সদস্যকে বাদ দেওয়া হলে পুরো পরিবার কীভাবে ফিরে যাবে—এই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
আরেকটি বড় সংকট রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতেও তাদের ‘রোহিঙ্গা’ না বলে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ফলে কেবল সীমান্ত পার করে মানুষ ফেরত পাঠালেই সমস্যার সমাধান হবে না—নাগরিকত্ব, আইনি পরিচয়, চলাচলের স্বাধীনতা, নিজ ভূমিতে বসবাস এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মিয়ানমার বলছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কিন্তু বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরাকান আর্মি রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কে মূল্যায়ন করবে—মিয়ানমার সরকার, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশ নাকি জাতিসংঘ—সেটিও পরিষ্কার নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী-বিষয়ক গবেষক রহমান নাসির উদ্দিনও বিষয়টিকে সতর্কভাবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ৩ লাখ মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনা যেন শেষ পর্যন্ত বাকি রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়ার ভিত্তি না হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যাবাসনের আগে জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, আইনি পরিচয় এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের অধিকার—এই তিনটি প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর প্রয়োজন।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের পর ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আগের বিভিন্ন সময়ের বাস্তুচ্যুতদের মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও আজ পর্যন্ত বড় পরিসরে কোনো প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।
এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হলেও নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না থাকায় তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের কেউ স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফলে মিয়ানমারের নতুন ঘোষণাটি সংখ্যার দিক থেকে বড় হলেও এখনো বাস্তব প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা নয়। রোহিঙ্গা নেতাদের কাছে মূল প্রশ্নটি তিন লাখের তালিকা নয়; তারা জানতে চান—নিজ দেশে ফিরে তারা কি নাগরিক পরিচয়, নিরাপত্তা এবং নিজের ভূমিতে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের অধিকার পাবেন?
এসব নিশ্চয়তা ছাড়া ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ ঘোষণা তাদের কাছে নতুন আশার চেয়ে পুরোনো প্রতিশ্রুতিরই আরেক সংস্করণ।





