দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার, ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামী এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ নির্দেশিকা তৈরি এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী দুই থেকে তিন বছরে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের চিহ্নিত করে উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা হবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি নিরূপণের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি আগেভাগে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্থান সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন, তদারকি, আদায় ও শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সংস্কার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংক খাত থেকে সর্বোচ্চ কত অর্থ ঋণ নিতে পারবেন, সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাতে সুশাসন শক্তিশালী করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন এবং দেউলিয়াত্বসংক্রান্ত আইন সংশোধনের কাজ চলছে। দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণের এই বিপুল চাপ ব্যাংকগুলোর মূলধন, মুনাফা ও নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। তাই শুধু পুরোনো ঋণ আদায় নয়, ভবিষ্যতে নতুন ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কত শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিত করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, নিয়মিত নজরদারি, শক্তিশালী ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।





