দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে এক বছর থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ে তদারকি বাড়ানো, বড় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আনা, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের উৎসাহিত করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিকল্পনাটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় চাপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।

এক বছরের মধ্যে আদায় কার্যক্রমে জোর

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মেয়াদ এক বছর। এ সময়ে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাসে পর্যালোচনা বৈঠক করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বৈঠকে ঋণ আদায়ের পথে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হবে এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

এ ছাড়া ব্যাংকার্স সভায় প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বেশি, সেগুলোর জন্য ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশলবিষয়ক বিশেষ নির্দেশিকাও তৈরি করা হবে। পাশাপাশি হালনাগাদ করা হবে বিদ্যমান ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা।

বিশেষ প্রতিবেদন

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী দুই থেকে তিন বছরে ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা তৈরি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের সক্রিয়তা বাড়ানো এবং আদায় প্রক্রিয়ায় গতি আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের চিহ্নিত করে পুরস্কার বা অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধে গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়বে এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের সম্পর্ক আরও দায়িত্বশীল হবে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আরেকটি বড় উদ্যোগ হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ অনুসারে সম্ভাব্য ঋণক্ষতির ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও সংস্থান সংরক্ষণব্যবস্থা চালু করা। ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ বা সম্ভাব্য ঋণক্ষতি পদ্ধতিতে ঋণের বর্তমান অবস্থা বিবেচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্ষতির আশঙ্কাও হিসাবের মধ্যে আনা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও এই ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে। সেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন পদ্ধতি পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

বড় ঋণে ব্যাংকের নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মেয়াদ চার থেকে পাঁচ বছর। এ সময়ে একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ কত অর্থ নিতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমানো।

এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নের প্রয়োজন হলে প্রচলিত ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বড় অঙ্কের অর্থায়নের পুরো চাপ ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওর ওপর না পড়ে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আদালতকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণগ্রহীতারা রিট আবেদন করে যাতে ঋণ আদায়ের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে না পারেন, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬ প্রণয়নের কাজও এগোচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ বা ঋণ অধিগ্রহণ করে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ও অর্থ আদায়ে কাজ করতে পারবে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরানোর চ্যালেঞ্জ

খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সুশাসন জোরদার করতেও আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া এবং ১৯৯৭ সালের দেউলিয়াত্ব আইন আধুনিকায়ন করে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ আদায় নয়; বরং ঋণ অনুমোদন, ঋণের ব্যবহার তদারকি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঋণ শ্রেণিকরণের প্রতিটি ধাপে দুর্বলতা কমানো। এতে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ রয়েছে।

তবে পরিকল্পনা ঘোষণা আর বাস্তবে ঋণ আদায় বাড়ানো এক বিষয় নয়। ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আনা, আদালতের দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং নতুন ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করার ওপর উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে আদায় কার্যক্রমে গতি আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা চলবে। তবে খেলাপি ঋণের বিপুল পরিমাণ কমিয়ে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, তা বোঝা যাবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ঋণ আদায়ের পরিসংখ্যানে।