দিনে তিন হাজারের বেশি রোগী, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় জাতীয় চক্ষু হাসপাতাল

ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছেন। রোগীর এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে চোখের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অস্ত্রোপচারের তারিখ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়ছেন রোগীরা।

রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতালটির সেবার এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে রোগী ও স্বজনদের বক্তব্যের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও রোগীর সংখ্যা ও হাসপাতালের বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

ছানি অস্ত্রোপচারে চাহিদা অনেক বেশি

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের অন্যতম প্রধান বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে জটিল চোখের রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি ছানি, রেটিনা, গ্লুকোমা ও কর্নিয়ার বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসা দেওয়া হয়। সরকারি এই হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা আসেন।

তবে রোগীর চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অস্ত্রোপচার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সোহেলের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতিদিন বিনামূল্যে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ জনের ছানি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। অথচ ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী আসেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অপারেশন থিয়েটারের বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করে এর চেয়ে বেশি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক রোগীকে পরবর্তী তারিখের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে এক রোগীর স্বজন জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য আরও ১৫ দিন অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও দীর্ঘ অপেক্ষা

অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা করাতেও রোগীদের সময় লাগছে। বিশেষ করে সিএফপি পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতা নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চোখের রেটিনা ও অপটিক নার্ভের ছবি তোলার এই পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে তিনটি যন্ত্র রয়েছে। তবে কয়েক মাস আগে এর মধ্যে দুটি যন্ত্র বিকল হয়ে যায়। ফলে পরীক্ষার সক্ষমতা কমে গিয়ে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সোহেলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ জনের সিএফপি পরীক্ষা করা যাচ্ছে। পুরোনো রোগীদের পাশাপাশি নতুন রোগীদেরও পরীক্ষার তারিখ দিতে হচ্ছে। যন্ত্রের ত্রুটি মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগায় জমে থাকা পরীক্ষার চাপও দ্রুত কমানো যাচ্ছে না।

রোগীর চাপ কমাতে কী বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সোহেল জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি অপারেশন থিয়েটারের সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে অস্ত্রোপচার চালাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছানি অস্ত্রোপচার তুলনামূলকভাবে নিয়মিত করা যায় এমন চিকিৎসা হওয়ায় দেশের বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতাল এবং অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে এই সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাধারণ ছানির অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের নিজ নিজ অঞ্চলের হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভর করার পরামর্শও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ওপর চাপ কমতে পারে এবং জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের সেবা দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে রোগীর চাপ কমাতে শুধু অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ যথেষ্ট নয়। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে চক্ষু চিকিৎসার সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ চিকিৎসক এবং অস্ত্রোপচারের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে বিকল যন্ত্র দ্রুত মেরামত, জনবল ঘাটতি পর্যালোচনা এবং রোগীর অপেক্ষার সময় কমানোর কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সেবার সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রতিদিন হাজারো রোগীর চাপের বিপরীতে পরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের সীমিত সক্ষমতা থাকলে অপেক্ষা কমানো কঠিন।

রোগীদের ভোগান্তি কমাতে তাই একদিকে হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে আসার প্রয়োজন কমবে এবং জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতালও জটিল রোগীদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।