রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) না থাকায় জটিল শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চোখের অস্ত্রোপচার ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত যেসব রোগীর অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, তাঁদের অন্য সরকারি হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। এতে নতুন হাসপাতালে ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের তারিখ পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
৬০ বছর বয়সী বরিশালের উজিরপুরের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল এর একটি উদাহরণ। চোখের কোটরে টিউমার ধরা পড়ার পর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকায় অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা জানান। হাসপাতালটিতে আইসিইউ না থাকায় তাঁকে অন্য হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। কিন্তু দ্রুত অস্ত্রোপচারের সময় পাননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে প্রায় দুই মাস অপেক্ষা করতে বলা হয়। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর আর্থিক সামর্থ্যও তাঁর নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
সব চোখের অস্ত্রোপচারে আইসিইউ প্রয়োজন হয় না
চিকিৎসকেরা বলছেন, চোখের সব অস্ত্রোপচারের জন্য আইসিইউ প্রয়োজন হয় না। ছানির মতো সাধারণ অস্ত্রোপচার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় অবশকারী ওষুধ বা চোখের ড্রপ ব্যবহার করেই করা সম্ভব।
তবে রেটিনার কিছু জটিল অস্ত্রোপচার, চোখের পেশিসংক্রান্ত নির্দিষ্ট অপারেশন এবং যেসব ক্ষেত্রে রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন করতে হয়, সেসব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। হৃদ্রোগসহ গুরুতর শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ সতর্কতা আরও জরুরি।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাঈদ মাহবুব উল কাদির জানিয়েছেন, যেসব হৃদ্রোগীর অস্ত্রোপচারে সাধারণ অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োজন, তাঁদের আইসিইউ সুবিধা রয়েছে এমন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বলা হয়।
প্রতিদিন চার হাজার রোগীর চাপ
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় চার হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০ থেকে ৮০টি অস্ত্রোপচার হয়। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি ছানির অস্ত্রোপচার। বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ হাজার চোখের অস্ত্রোপচার করা হয়।
এ ছাড়া হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২২০ থেকে ২৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে বছরে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ রোগী সেবা নেন। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালটির বিদ্যমান অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
সাত শয্যার আইসিইউ স্থাপনের তথ্য থাকলেও চালু হয়নি
হাসপাতালটিতে আইসিইউ নিয়ে অতীতেও আলোচনা হয়েছে। বণিক বার্তার ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, করোনাভাইরাস মহামারির সময় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সাত শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল। তবে সেটি চালু করা হয়নি বলে তখনকার পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের হালনাগাদ তথ্যেও হাসপাতালটির আইসিইউ শয্যা শূন্য দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ আগে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের তথ্য থাকলেও বর্তমানে সেখানে কার্যকর আইসিইউ সেবা নেই।
আইসিইউ চালু করতে প্রয়োজন জায়গা ও জনবল
বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাঈদ মাহবুব উল কাদির জানিয়েছেন, আইসিইউ চালু করা এককভাবে হাসপাতাল পরিচালকের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, প্রশিক্ষিত জনবল, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সরঞ্জাম দরকার।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সুযোগ তৈরি হলে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন পরিচালক।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের জন্য আইসিইউর অভাবের পাশাপাশি অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়টিও বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নতুন হাসপাতালে আবার নিবন্ধন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের তারিখ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসায় দেরির পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের যাতায়াত এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
বিশেষায়িত এই হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা চালু হলে জটিল শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চোখের অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা একই প্রতিষ্ঠানে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।



