দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করায় হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা প্রস্তুতি ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। রোগী শনাক্ত, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং জটিল রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২ জন এবং মৃ/ত্যু হয়েছে ২৯৯ জনের। অক্টোবরের শুরুতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদেরও এই উদ্যোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণে রোগীর অবস্থা দ্রুত মূল্যায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্ত এবং জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রশিক্ষণ আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানোর সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে লালচে দাগ।

অন্যদিকে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস কিংবা অস্থিরতা গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু সন্দেহ হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি ও প্রয়োজনীয় তরল খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। জ্বর ও ব্যথার জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ফুলের টব, পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার, পানির পাত্র, ছাদ ও নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্তত সপ্তাহে একবার পানি সংরক্ষণের পাত্র খালি করে পরিষ্কার করা, অব্যবহৃত পাত্র সরিয়ে রাখা এবং পানির ট্যাংক ঢেকে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

এ ছাড়া দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা, জানালায় মশা প্রতিরোধক জালি লাগানো এবং বয়স ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করে কামড়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু হাসপাতাল বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নয়। নিজ নিজ বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সবাইকে অংশ নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রস্তুতি বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি রোগীর বিপজ্জনক লক্ষণ সম্পর্কে পরিবারগুলোকে সচেতন করাও জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া এবং মশার বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর জটিলতা ও মৃ/ত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব।