বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে টানা কয়েক দিনের অস্থিরতার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এতে রপ্তানি পণ্যের নির্ধারিত চালান পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মজুরি সমন্বয়ের দাবি জোরালো হয়।
শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যায্য ছাঁটাই বন্ধ, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিও জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
একপর্যায়ে প্রায় ৬৯০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
আন্দোলনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও ঢাকার মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ নভেম্বর প্রায় ৬৭৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। কিছু কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
১ নভেম্বর কারখানা মালিকদের এক বৈঠকে শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়। মালিকপক্ষের বক্তব্য ছিল, উৎপাদন চালু রাখার মতো পরিস্থিতি না থাকলে প্রতিদিন কারখানা খোলা রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার হিসাব এক নয়। কারণ, একেকটি প্রতিবেদন একেক দিনের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
নতুন মজুরি বোর্ড, ডিসেম্বর থেকে কার্যকরের সিদ্ধান্ত
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় সৈয়দ আজাদ সুবহানীকে। এতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রয়েছেন।
৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার জানান, ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন। নতুন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকেরা জানুয়ারি ২০২৭ থেকে সংশোধিত বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে।
কারখানা মালিকদের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিনও ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের বিষয়ে সম্মতির কথা জানান। তবে নতুন মজুরি কত টাকা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবি জানানো হয়েছে।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের প্রয়োজন এবং শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকগুলোতে মজুরির পরিমাণ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ফিরলেও আশুলিয়ায় অস্থিরতা
মজুরি বোর্ড গঠন ও আলোচনার উদ্যোগের পর বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার প্রবণতা দেখা যায়। ৫ নভেম্বর থেকে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরের অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।
৬ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুরের প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানা চালু ছিল বলে জানিয়েছেন জেলার শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন। নারায়ণগঞ্জেও কারখানার কার্যক্রম ও যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। মিরপুরের অধিকাংশ কারখানায়ও শ্রমিকেরা কাজে ফেরেন।
তবে সাভার ও আশুলিয়ার কিছু এলাকায় উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। ঢাকা ট্রিবিউনের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশুলিয়ার ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। কিছু এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৩ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করে। মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারিতে ড্রোন ব্যবহারের তথ্যও জানিয়েছে বিজিবি।
ঢাকা ট্রিবিউনের ৬ নভেম্বরের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সাভার ও আশুলিয়ার ৮৮টি কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন। জরুরি রপ্তানি আদেশের পণ্য প্রস্তুত ও সরবরাহের সময়সীমা রক্ষায় কয়েকটি কারখানা সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদন চালু রাখে। একই প্রতিবেদনে ৮ নভেম্বর থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশার কথা জানানো হয়। তবে এটি ছিল মালিকপক্ষের প্রত্যাশা, পূর্ণ উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ার তথ্য নয়।
বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগ, রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি, ভবিষ্যৎ অর্ডার এবং বাংলাদেশের বাজার-সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচি পর্যবেক্ষণ করছেন। সুইডেনভিত্তিক একটি বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের ঢাকাস্থ এক কর্মকর্তা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পরবর্তী দুই মাসের জন্য বাংলাদেশ থেকে অর্ডার কমানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন উদ্যোক্তার আশঙ্কা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা না গেলে কিছু রপ্তানি আদেশ ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশে চলে যেতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্ব হলে ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইতে পারেন, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় চাপাতে পারেন অথবা ভবিষ্যতের অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রভাব শুধু কারখানা বা শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়ে।
মজুরি ও উৎপাদন ব্যয়ের ভারসাম্য কতটা সম্ভব?
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারখানা মালিকদের মতে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধি যুক্ত হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
৬ নভেম্বর প্রকাশিত ফাইবার২ফ্যাশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষের আগেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উৎপাদনকে প্রভাবিত করছিল। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছিল না। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি না বাড়ালে কর্মজীবন ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি এবং কারখানার আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
কয়েক দিনের অস্থিরতার পর পোশাকশিল্পে উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেও মজুরি নিয়ে মূল বিরোধের সমাধান এখনো হয়নি। নতুন মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সুপারিশ, শ্রমিকদের প্রত্যাশা এবং মালিকদের সক্ষমতার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় তৈরি হয়, তার ওপর নির্ভর করছে শিল্পটির পরবর্তী পরিস্থিতি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং নতুন রপ্তানি আদেশ ধরে রাখাও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখতে কার্যকর আলোচনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা এগোয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।




