দেশে গ্যাসের চাহিদা আর সরবরাহের ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরেই বড় হচ্ছে। শিল্পকারখানা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র—বিভিন্ন খাতে সংকটের প্রভাব পড়ছে সরাসরি। আমদানি করা LNG দিয়ে ঘাটতি সামলানোর চেষ্টা চললেও আন্তর্জাতিক বাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং ডলারের ওপর চাপের কারণে আবারও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে সরকার।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাস কূপে drilling ও workover কার্যক্রম। নতুন সম্ভাবনাময় স্থানে কূপ খননের পাশাপাশি পুরোনো কূপ মেরামত ও পুনরায় উৎপাদনে আনার কাজও এর মধ্যে রয়েছে।
জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির অধীনে ২৯টি কূপে drilling বা workover সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও আটটির কাজ চলছিল। এসব সম্পন্ন কূপে প্রায় ২৭০.৮ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক গ্যাসের সম্ভাবনা চিহ্নিত হলেও প্রাথমিকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৩৯.৬ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা আরও বড়। পুরো ১৫০ কূপের কর্মসূচি সফল হলে দৈনিক প্রায় ১.৮৪ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন seismic survey, offshore bidding এবং BAPEX-এর drilling সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে।
তবে সংখ্যার এই আশাবাদী ছবির বিপরীতে মাঠের বাস্তবতা বেশ কঠিন।
গত কয়েক বছরে ১৫০-কূপ কর্মসূচির আওতায় নতুন উৎপাদন যোগ হলেও একই সময়ে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমেছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে Financial Express জানিয়েছে, চার বছরে drilling কর্মসূচি থেকে প্রায় ১২৬ mmcfd গ্যাস যোগ হলেও রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর স্থানীয় উৎপাদন একই সময়ে প্রায় ১৪০ mmcfd কমেছে। অর্থাৎ নতুন গ্যাস যোগ করার পরও পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন পতন সামগ্রিক অগ্রগতিকে অনেকটাই আটকে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগও মূলত এখানেই। বাংলাদেশের অনেক বড় গ্যাসক্ষেত্র বহু বছর ধরে উৎপাদনে থাকায় সেগুলোর স্বাভাবিক চাপ ও উৎপাদনক্ষমতা কমছে। কিছু কূপে প্রত্যাশামতো মজুত পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও ভূতাত্ত্বিক জটিলতা রয়েছে, আবার নতুন গ্যাস আবিষ্কার হলেও তা দ্রুত জাতীয় গ্রিডে তুলতে প্রয়োজনীয় pipeline ও processing infrastructure সব জায়গায় প্রস্তুত নেই।
বর্তমানে দেশের গ্যাস চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। সাম্প্রতিক হিসাবে সম্মিলিত সরবরাহ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক, যেখানে চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ঘনফুট LNG আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই নির্ভরতার ঝুঁকি সাম্প্রতিক সময়েই স্পষ্ট হয়েছে। LNG terminal-এ কারিগরি সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য খাতে দ্রুত চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়িও আরোপ করতে হয়েছে সরকারকে।
তাই ১৫০ কূপের কর্মসূচি গ্যাস সংকট সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি কোনো তাৎক্ষণিক ‘ম্যাজিক সমাধান’ নয়। কাজ শেষ করতে সময় লাগবে, সব কূপে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস মিলবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। একই সঙ্গে পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন পতন ঠেকানো, নতুন আবিষ্কারের গ্যাস দ্রুত গ্রিডে আনা এবং offshore exploration এগিয়ে নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জটি তাই শুধু কতগুলো কূপ খনন হবে, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন—নতুন কূপ থেকে যত গ্যাস পাওয়া যাবে, তা কি পুরোনো ক্ষেত্রের দ্রুত কমে যাওয়া উৎপাদন পুষিয়ে দেশের বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে?





