বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সেপ্টেম্বরের Asian Development Outlook (ADO)-এ সংস্থাটি আগের জুলাইয়ের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ০ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে নতুন এই পূর্বাভাস দিয়েছে।
এডিবির হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা আনুমানিক ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৭ অর্থবছরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও প্রবৃদ্ধির গতি এখনও সীমিত থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি সংকট বড় বাধা
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পেছনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের চাপকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে এডিবি। খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক ভিত্তি, তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকগুলোর ঝোঁক এবং উচ্চ ঋণব্যয়—সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সীমিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ, সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া। এসব কারণে বিনিয়োগের গতি কমছে এবং মুদ্রানীতি বা সরকারি প্রণোদনার সুফলও অর্থনীতিতে পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না বলে মনে করছে এডিবি।
এডিবির হিসাবে, ২০২৭ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতিই এ খাতের ওপর চাপ তৈরি করবে।
অন্যদিকে সেবা খাত ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। কৃষিও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। প্রবাসী আয় থেকে পাওয়া সমর্থনের কারণে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকতে পারে, যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করবে।
মূল্যস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে বলে অনুমান করা হলেও ২০২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ শতাংশ হতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সম্ভাব্য জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাবকে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এডিবি। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে মুদ্রানীতি শিথিল হওয়ার প্রভাবও মূল্যস্ফীতিতে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও চাপ
এডিবি বলছে, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ২০২৬ অর্থবছরে এই ঘাটতি আনুমানিক ০ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। আমদানি রপ্তানির তুলনায় দ্রুত বাড়ার কারণেই ঘাটতি বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রবাসী আয় তুলনামূলক শক্তিশালী থাকবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। উচ্চতর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও শক্তিশালী রেমিট্যান্স বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক প্রবাহ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা এবং সতর্ক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও ঝুঁকি
২০২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ধীর হয়েছিল বলে এডিবি জানিয়েছে। তবে এর সামগ্রিক প্রভাব সীমিত থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আগামী দিনের জন্য ঝুঁকির তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানি তেলের দাম বাড়া, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন, বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিষয়গুলো রেখেছে এডিবি। দেশের ভেতরে ব্যাংকিং খাতে আরও চাপ, রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কারে বিলম্ব, উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়া এবং জলবায়ুজনিত ধাক্কাও প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সংস্কারে গতি বাড়ানোর পরামর্শ
বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝ্যাং বলেছেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখালেও এই পুনরুদ্ধার বহিরাগত ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমার সঙ্গে ভোগ ও বিনিয়োগে কিছুটা গতি ফিরতে পারে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও উচ্চ ব্যয়ের মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে সেই পুনরুদ্ধারের গতি সীমিতই থাকতে পারে।
এদিকে চলতি ২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এডিবির সর্বশেষ ৪ শতাংশ পূর্বাভাস সেই সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
