বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যানজট, বায়ুদূষণ ও নিরাপদ যাতায়াতের চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিনের। নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে মোটরযানের আধিক্যের মধ্যে সাইকেল আরোহী ও পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর সড়কে ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথক সাইকেল ট্র্যাক চালু হওয়ায় পরিবেশবান্ধব নগর যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় সাইকেল ট্র্যাকটির উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিটি করপোরেশনের বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণ ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ট্র্যাকটি নির্মাণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত সড়কের এক পাশে হাঁটার পথের পাশাপাশি সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন এটিকে দেশের প্রথম পৃথক সাইকেল ট্র্যাক হিসেবে উল্লেখ করেছে। কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, নতুন এই অবকাঠামো সাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা বাড়াবে এবং নগরবাসীকে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতে উৎসাহিত করবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রামের আরও এলাকায় পর্যায়ক্রমে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নগরবাসীর হাঁটার সুযোগ বাড়াতে খালের দুই পাশসহ উপযোগী স্থানে ওয়াকওয়ে তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তবে একটি পৃথক সাইকেল ট্র্যাক চালু করলেই নগরীর সামগ্রিক যানজট ও দূষণ সমস্যার সমাধান হবে না। দৈনন্দিন যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে সাইকেলকে জনপ্রিয় করতে হলে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও গণপরিবহন কেন্দ্রের সঙ্গে নিরাপদ সাইকেল পথের সংযোগ থাকা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন এসক্যাপ) ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে গণপরিবহনের প্রাপ্যতা, মোটরবিহীন যানবাহনের অবকাঠামো, যাতায়াতের ব্যয়, সড়ক নিরাপত্তা এবং বায়ুর মানসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পরিবহনব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।

অন্যদিকে চট্টগ্রামে পরিবহনের সঙ্গে বায়ু ও শব্দদূষণের সম্পর্ক নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন পরিবহনমাধ্যমে যাতায়াতের সময় মানুষ দূষণের সংস্পর্শে আসছেন। বিশেষ করে দিনের শেষভাগে উন্মুক্ত পরিবহনমাধ্যমে চলাচলের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণের সংস্পর্শ বেশি পাওয়া গেছে।

এ ধরনের গবেষণা নগর পরিবহনে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাইকেল ট্র্যাকের পাশাপাশি নিরাপদ ফুটপাত, সুশৃঙ্খল বাস চলাচল, পথচারীদের সড়ক পারাপারের সুবিধা এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সহজ সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য সাইকেল ও হাঁটার উপযোগী অবকাঠামো থাকলে ব্যক্তিগত মোটরযানের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে যানজট ও দূষণ কমার সম্ভাবনা থাকলেও প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কত মানুষ নিয়মিত এসব সুবিধা ব্যবহার করছেন, তার ওপর।

এ ছাড়া সাইকেল ট্র্যাক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ পার্কিংমুক্ত রাখা এবং পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্য পৃথক চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরীর আরও এলাকায় সাইকেল ট্র্যাক সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে নতুন পথগুলোর অবস্থান, নির্মাণ ব্যয় ও বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

নগরীর পরিবহনব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন। যেখানে গণপরিবহন, সাইকেল, পথচারী এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য পৃথক ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকবে।

চট্টগ্রামের নতুন সাইকেল ট্র্যাক সেই পরিবর্তনের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে উদ্যোগটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর ব্যবহার, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে নগরীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে সংযোগ তৈরির ওপর।