প্রায় তিন বছর আগে উদ্বোধন হলেও এখনো পূর্ণ সুবিধা দিতে পারছে না চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। নয়টি র‍্যাম্পের পাঁচটিই এখনো নির্মাণাধীন থাকায় নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে সরাসরি এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠা বা নামার সুযোগ তৈরি হয়নি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বাস্তবায়ন করা প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চার লেনের এক্সপ্রেসওয়েটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করে বন্দর, বিমানবন্দর ও নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর যাতায়াত সহজ করার লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটির।

কিন্তু বর্তমানে এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ সীমিত। সর্বশেষ প্রতিবেদনে The Daily Star জানিয়েছে, নয়টি র‍্যাম্পের একটিও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে যান চলাচলের জন্য চালু হয়নি। ফলে মূলত লালখান বাজার ও পতেঙ্গার নির্ধারিত প্রবেশ-বের হওয়ার পয়েন্ট ব্যবহার করেই যানবাহন চলাচল করছে।

পরিকল্পনায় থাকা র‍্যাম্পগুলোর মধ্যে GEC ও আগ্রাবাদকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। GEC র‍্যাম্প চালু হলে GEC Circle, পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ, খুলশী ও মুরাদপুরসহ নগরের বড় আবাসিক এলাকাগুলো সরাসরি এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর আগ্রাবাদ র‍্যাম্প চালু হলে নগরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাটিও দ্রুত এই সড়কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটিতে প্রতিদিন অন্তত ৩২ হাজার ৪০০টি যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি যানবাহন ব্যবহার করছে সড়কটি। অর্থাৎ সক্ষমতার তুলনায় ব্যবহার এখনো অনেক কম।

র‍্যাম্পের কাজ পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের জটিলতার কথা জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর আগে সিডিএ জানিয়েছিল, নকশা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত নানা জটিলতায় প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করা র‍্যাম্পের সংখ্যা কমিয়ে নয়টিতে আনা হয়েছে।

তবে চলতি বছর জুলাইয়ে সিডিএর প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান জানিয়েছিলেন, নয়টি র‍্যাম্পের মধ্যে পাঁচটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং টোল বুথসহ কিছু আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে সেগুলো চালুর প্রস্তুতি চলছে। বাকি কাজ এ বছরের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের চিত্র অবশ্য দেখাচ্ছে, সব র‍্যাম্প এখনো ব্যবহারযোগ্য হয়নি। ৫ অক্টোবরের The Daily Star প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, GEC র‍্যাম্পে এখনো পাইলিংয়ের কাজ চলছিল। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংযোগ চালু হতে আরও সময় লাগছে।

এর প্রভাব পড়ছে এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবহারেও। ২০২৫ সালের একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রতিদিন প্রায় ৩৯ হাজার ৮০০ যানবাহন চলাচলের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার ১০০ যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেছে।

২০২৬ সালে ব্যবহার কিছুটা বেড়ে ১০ হাজারের বেশি হয়েছে বলে সিডিএ জানিয়েছে। তারপরও প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় তা অনেক কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো থেকে সরাসরি ওঠানামার সুযোগ না থাকায় অনেক গাড়িচালকের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার এখনো সুবিধাজনক হয়ে ওঠেনি।

এদিকে এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। জুনে The Daily Star–এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের স্থায়ী চেকপোস্ট, শৌচাগার ও পর্যাপ্ত পানির সুবিধা নেই; তাঁবুর নিচে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে এক্সপ্রেসওয়েটি উদ্বোধন করা হয়। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এর ওপর টোল আদায় শুরু হয়। প্রকল্পটি মূলত লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত দ্রুত যোগাযোগ এবং নগরের ব্যস্ত সড়কগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু তিন বছর পরও র‍্যাম্পের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে GEC ও আগ্রাবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ চালু না হওয়া পর্যন্ত নগরের বড় একটি অংশের মানুষ এক্সপ্রেসওয়ের সরাসরি সুবিধা থেকে বাইরে থাকবেন।

এখন সিডিএর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাকি র‍্যাম্পগুলোর নির্মাণ শেষ করে দ্রুত সেগুলো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া। কারণ এক্সপ্রেসওয়ের মূল কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সংযোগগুলো কার্যকর না হলে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প তার পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারছে না।