চট্টগ্রামে প্রবাসী এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সাব্বির হোসেন ওরফে সানিকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তিনি বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়। পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির পর সানির অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার সাতবসু গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় বসবাস করতেন।
ফোনে ৫০ লাখ টাকা দাবি, না দিলে হামলার হুমকি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টে হামজারবাগ এলাকার প্রবাসী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউসুফের ছেলে মোহাম্মদ শাওকাতের কাছে ফোন করে চাঁদা দাবি করেন সাব্বির। তাঁর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশের হাতে থাকা একটি অডিও রেকর্ডে চাঁদা দাবির কথোপকথন পাওয়া গেছে। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগাযোগ না করলে ৫০ লাখ টাকার দাবি বাড়িয়ে এক কোটি টাকা করার হুমকি দিতে শোনা যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীর বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
মাসে ৫০ হাজার টাকা পেতেন বলে পুলিশের দাবি
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সানি মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। পুলিশের ভাষ্য, বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় তিনি ফোন করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করতেন।
পুলিশ আরও জানায়, কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের পরিবর্তে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সানিকে। বড় সাজ্জাদের পাশাপাশি তাঁর সহযোগী বোরহান উদ্দিনের নির্দেশনাও তিনি অনুসরণ করতেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, সানি সাধারণত প্রকাশ্যে চলাফেরা করতেন না। ফোনে লক্ষ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দাবির সময়সীমা বেঁধে দিতেন। টাকা না দিলে স্থানীয় সহযোগীদের দিয়ে হামলা বা গুলির ঘটনা ঘটানোর হুমকি দেওয়া হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ভবনের ফটকে গুলির ঘটনার সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় রুনা টাওয়ার নামের একটি ভবনের ফটকে দুই যুবক গিয়ে গুলি ছোড়ে। ভবনটির মালিক মোহাম্মদ ইউসুফের দুই ছেলে প্রবাসে থাকেন। এর আগে তাঁর বড় ছেলের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ওই ঘটনার সঙ্গে চাঁদা দাবির যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সানির বিরুদ্ধে থাকা অডিও রেকর্ডসহ অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে।
পাঁচলাইশ ও হাটহাজারীতে দুটি মামলা
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাব্বির হোসেন সানির বিরুদ্ধে নগরের পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী থানায় পৃথক দুটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগও পেয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল জানিয়েছেন, সানির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তাঁর সহযোগীদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত
পুলিশের ভাষ্য, বড় সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। পুলিশের তৎপরতার কারণে চক্রটির কয়েকজন সদস্য চট্টগ্রাম ছেড়ে অন্য জেলায় আত্মগোপন করেছেন বলে দাবি করেছে জেলা পুলিশ।
সানিকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়িত চক্রটির আরও সদস্যের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া সাব্বির হোসেন সানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ অডিও রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে।



