কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন ধরে গেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে শুরু হওয়া আগুন বুধবার (২৮ অক্টোবর) পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অগ্নিনির্বাপণ দল কাজ করছে। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত
মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকার একটি বসতভিটায় নলকূপ খননের গর্ত থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে কাছাকাছি বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচকর্মীদের সুপারভাইজার বেলাল উদ্দিনের বরাত দিয়ে বাসস জানায়, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি সেখানে রিসোর্ট নির্মাণের জন্য জমি প্রস্তুত করছিলেন। পানির ব্যবস্থা করতে প্রায় ১ হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত নলকূপ খনন করা হলেও পানি না পাওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। পরে গর্ত থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী
খবর পেয়ে উখিয়া ও কক্সবাজার সদর থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। আগুনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালাতে হয়। মঙ্গলবার দুপুরের পর সেনাবাহিনীর অগ্নিনির্বাপণ দলও কাজে যোগ দেয়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। প্রাথমিকভাবে ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতিকেই এ ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে গ্যাসের প্রকৃতি ও উৎস পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
আগুন ছড়িয়ে পড়া এবং বিদ্যুতের লাইনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের চলাচল সীমিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া প্রতিবেদনগুলোতে এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আগুনের প্রকৃত কারণ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কত সময় লাগবে, তা বিশেষজ্ঞদের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে বাপেক্স
ঘটনার পর গ্যাসের উৎস ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থা পরীক্ষা করতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল কাজ শুরু করেছে। বুধবার সকালে দলটি ঘটনাস্থলে অনুসন্ধান চালায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতেও বিশেষজ্ঞরা সেখানে গিয়েছিলেন। বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের ব্যবস্থাপক এস এম নাফিউন আরহামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ফুট গভীরে খননকাজ চলায় গ্যাসসমৃদ্ধ স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরের দিকে উঠে খননগর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে বলেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তবে পরীক্ষার ফল ছাড়া গ্যাসের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
এখন নজর আগুন নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ফলের দিকে
ইনানীর এ ঘটনা ঘিরে এখন দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রথমত, নির্গত গ্যাসের কারণে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, গ্যাসের উৎস ও ধরন শনাক্ত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও শুধু এ ঘটনা থেকে ওই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সে জন্য ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন। বাপেক্সের তদন্তের ফল প্রকাশিত হলে ইনানীর এই গ্যাস নির্গমনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।








