বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন আরও সহজ করতে দেশে একটি চীনা ব্যাংকের শাখা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বিসিসিসিআই। সংগঠনটির দাবি, সরাসরি ব্যাংকিং সুবিধা তৈরি হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের লেনদেন দ্রুত হবে, খরচ কমবে এবং বিনিয়োগ যোগাযোগও সহজ হবে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খানের সঙ্গে বৈঠকে বিসিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এ প্রস্তাব দেয়। বৈঠকে বাংলাদেশ চীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে মোট ছয়টি লিখিত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলে ধরা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও মো. আতাউর রহমান খানকে বর্তমান বাণিজ্যসচিব হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চীনা ব্যাংকের শাখা স্থাপনের বিষয়টি। বিসিসিসিআই সভাপতি খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, কিছু চীনা ব্যাংক বাংলাদেশে শাখা চালু করতে আগ্রহী। কুনমিংয়ে সাম্প্রতিক সফরের সময় এ বিষয়ে একটি চীনা ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে কোন ব্যাংকের সঙ্গে সেই সমঝোতা হয়েছে, প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
খোরশেদ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। এত বড় বাণিজ্য সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো চীনা ব্যাংকের শাখা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। তুলনায় শ্রীলঙ্কার মতো ছোট বাণিজ্য অংশীদার দেশেও চীনা ব্যাংকের শাখা থাকার উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থায় চীনা ইউয়ানে বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিংয়ের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ইউয়ানে লেনদেন করা সম্ভব। তারপরও বিসিসিসিআইয়ের যুক্তি, বাংলাদেশে সরাসরি একটি চীনা ব্যাংকের উপস্থিতি থাকলে আমদানি, রপ্তানি এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত আর্থিক যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে।
তবে চীনা ব্যাংকের শাখা খোলাই বিসিসিসিআইয়ের একমাত্র প্রস্তাব নয়। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের অন্তত ২০টি স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে তৈরি পণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে চীনা ক্রেতা ও পরিবেশকদের কাছে স্থানীয় পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আলাদা উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি চীনের বড় বড় বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিসিসিসিআই সম্প্রতি কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত দশম চীন দক্ষিণ এশিয়া এক্সপোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও বৈঠকে তুলে ধরে। ওই এক্সপোতে অংশ নিতে সংগঠনটির সভাপতির নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল চীনে গিয়েছিল। তাদের মতে, এ ধরনের মেলা বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং এবং নতুন চীনা বিনিয়োগকারী আকর্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
বৈঠকে আরেকটি বড় বিষয় ছিল বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার। বিসিসিসিআইয়ের অভিযোগ, শুল্ক সুবিধায় আনা কিছু পণ্য অননুমোদিতভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের অনিয়ম সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে চীনা ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
এ কারণে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে আরও কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বিসিসিসিআই। সংগঠনটি বলছে, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এই জায়গায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্কের বড় বাস্তবতা হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান, এবং একক হিসাবে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও বাংলাদেশ দেশটিতে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে, তার তুলনায় আমদানি অনেক বেশি। ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, বিপরীতে আমদানি ছিল প্রায় ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার।
এই ব্যবধান কমাতে সরকারও সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, চীন ও ভারতের সঙ্গে বড় বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও কোনো একক দেশের জন্য আলাদা সমাধানের চেয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো বেশি জরুরি।
বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে শুল্ক সুবিধা আগের তুলনায় বেড়েছে। তারপরও রপ্তানির পরিমাণ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বিশ্লেষকেরা এর পেছনে পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য, চীনা বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব, সরবরাহ ও বিপণন নেটওয়ার্কের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা বলে আসছেন।
এ অবস্থায় স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবকে শুধু পণ্য প্রদর্শনের উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না বিসিসিসিআই। লক্ষ্য হলো চীনা বাজারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড ও পণ্যের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি করা, যাতে স্থানীয় ক্রেতা, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগও সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল বাস্তবায়ন এগোচ্ছে, যেখানে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও এর আগে চীনের ক্রস বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম, CIPS নিয়ে আলোচনায় ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এটিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। ফলে বাংলাদেশ চীন আর্থিক সংযোগ বাড়ানোর আলোচনা শুধু একটি ব্যাংক শাখার প্রস্তাবেই সীমিত নেই।
তবে বিসিসিসিআইয়ের নতুন ছয় দফা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশে কোনো চীনা ব্যাংকের শাখা খোলার বিষয়ে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে, এমন তথ্য সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ১০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পরও এ বিষয়ে নতুন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
বিসিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদলে সংগঠনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জিংচাও ও এ জেড এম আজিজুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল জামিলুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক মো. আবু তাহেরও উপস্থিত ছিলেন। এখন নজর থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রস্তাবগুলো নিয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, বিশেষ করে চীনা ব্যাংকের শাখা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবে কতটা এগোয়।



