ছয় মাসেই সরকারের ‘ব্যর্থতার’ অভিযোগ বিরোধীদের—দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে চাপ
ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি সরকার। এই সময়কে কেন্দ্র করে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। সরকারের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর দেশে স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় বেশ কিছু উদ্যোগ এগিয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলোর মূল্যায়ন অনেক বেশি কঠোর।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। পরদিনই প্রথম দফার অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে আসে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। ছয় মাস পর এসে এই তিন ক্ষেত্রই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখছেন না। তার অভিযোগ, নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বেড়েছে। নিয়োগ ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধায় দলীয় লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা NCP-ও সরকারের performance নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদের বক্তব্য, ছয় মাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সরকার প্রত্যাশিত ফল দেখাতে পারেনি। জাতীয় স্বার্থের বড় ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরও সমন্বয়ের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনও তীব্র হয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপণ্যের দাম এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ তুলে কর্মসূচি করেছে। আগস্টের শুরুতে সচিবালয় অভিমুখে তাদের কর্মসূচি পুলিশের বাধার মুখেও পড়ে।
অন্যদিকে সরকারের ভাষ্য, ছয় মাসের পুরো চিত্রকে শুধু চলমান সংকট দিয়ে বিচার করলে অগ্রগতির অংশ বাদ পড়ে যাবে। সরকারি ও স্বাধীন মূল্যায়নে রাজনৈতিক পরিবেশে আগের তুলনায় স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। জুলাইয়ে point-to-point মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে নেমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও বাজারে সেই স্বস্তি এখনও পুরোপুরি পৌঁছেনি বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্য বিপরীত। বিরোধীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুললেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, গত ১৮০ দিনে দেশের আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট অবশ্য সরকারও অস্বীকার করছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শুরুতে বলেছেন, জনগণের কষ্টের বিষয়টি সরকার জানে এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, LNG সংগ্রহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি নিশ্চিত করাসহ তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ আবার বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের সমস্যার সমাধান মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়। সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরির মতে, দুর্বল অর্থনীতি ঠিক করতে আরও সময় প্রয়োজন; তবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও কার্যকর বিকল্প বের করতে হবে।
ফলে সরকারের ছয় মাস পূর্তি ঘিরে আলোচনাটি এখন শুধু “সফল না ব্যর্থ”—এই দুই শব্দে আটকে নেই। সামনে বড় পরীক্ষা হবে নিত্যপণ্যের বাজারে বাস্তব স্বস্তি ফেরানো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতির সরকারি দাবি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় কতটা প্রতিফলিত হয়।



