বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা আরও বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে জার্মানি। জার্মান-দক্ষিণ এশীয় সংসদীয় গ্রুপের তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে ভোলায় প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

জার্মান সংসদ সদস্য নিকলাস কাপ্পের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে তারা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে।

বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

জার্মান দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। তবে এটি এখনো সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে; কোনো নতুন গ্যাস উত্তোলন চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই পক্ষ। বর্তমানে বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্কের মূল কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা ও বাণিজ্য সুবিধা রয়েছে; নতুন কোনো এফটিএ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ইইউ বর্তমানে একটি পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়েও আলোচনা করছে।

বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইইউর পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। বাংলাদেশের ইইউমুখী রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ প্রায় ৯৪ শতাংশ।

সফরের সময় জার্মান প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেয়। তারা হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস, সিএইচটি ও সিগওয়ার্কসহ কয়েকটি জার্মান শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে এবং নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন ঘুরে দেখে। বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে, পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও কথা হয়।

জ্বালানি সহযোগিতার আলোচনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ নিজেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল, যার মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসছিল ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯৯১ মিলিয়ন ঘনফুট।

সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও জার্মান প্রতিনিধিদল সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

এ ছাড়া গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। প্রতিনিধিদলের উপপ্রধান উলে শাউস বাংলাদেশের নারী অধিকার ও পরিবেশবিষয়ক কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সব মিলিয়ে জার্মান প্রতিনিধিদলের সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ভোলার গ্যাস উত্তোলন বা বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি; পরবর্তী আলোচনার মধ্য দিয়েই এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নির্ধারিত হবে।