ওয়ানডে ক্রিকেটে আইসিসির পরিবর্তিত বল ব্যবহারের নিয়মে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ইনিংসের শেষ দিকে পুরোনো বলের রিভার্স সুইং সামলাতে সমস্যায় পড়ছেন ব্যাটসম্যানরা। অন্যদিকে বাংলাদেশের পেসাররা আগের তুলনায় বেশি সুইং পেলেও সেটিকে প্রত্যাশিত সাফল্যে রূপ দিতে পারছেন না।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে সাদা বল ব্যবহারের নিয়ম পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইনিংসের প্রথম ৩৪ ওভার দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বল ব্যবহার করা হয়। এরপর ফিল্ডিং দলের অধিনায়ক ওই দুটি বলের একটি বেছে নেন। অবশিষ্ট ১৬ ওভার নির্বাচিত বলটি দিয়েই খেলা হয়।
এই পরিবর্তনের ফলে ইনিংসের শেষ দিকে অপেক্ষাকৃত পুরোনো বল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে পেসারদের রিভার্স সুইং পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দলের বোলাররা সেই সুবিধা কাজে লাগালেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
ক্রিকেটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিকভিজের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর ডেথ ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বল সুইং করার পরিমাণ বেড়েছে ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে তাঁর বোলিং গড় বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে শূন্য দশমিক ৯।
তাসকিন আহমেদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা। তাঁর সুইং বেড়েছে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ বোলিং গড় বেড়েছে ১ দশমিক ৯ এবং ইকোনমি রেট বেড়েছে ১ দশমিক ৬। অর্থাৎ বাড়তি সুইং পেলেও শেষ দিকে প্রতিপক্ষের রান আটকাতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছেন না বাংলাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ পেসার।
বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডি এবং পাকিস্তানের নাসিম শাহর মতো পেসাররা পরিবর্তিত নিয়মে নিজেদের বোলিং আরও কার্যকর করতে পেরেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, শুধু বল সুইং করানো নয়, সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে উইকেট নেওয়া ও রান নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার জায়গা ব্যাটিং। নিয়ম পরিবর্তনের আগে ওয়ানডের শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের রানরেট ছিল ৭ দশমিক ৮৪। পরিবর্তনের পর সেটি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৬-তে। অর্থাৎ ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতি ওভারে গড়ে ১ দশমিক ২৮ রান কম তুলছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে একই সময়ে ভারতের ডেথ ওভারের রানরেট ৬ দশমিক ৯৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৩। ইংল্যান্ডের রানরেটও ৮ দশমিক ০৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬-তে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দলগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্যাটিং সমস্যার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া গেছে আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ ৩৩ দশমিক ৪ ওভারে ১৭২ রানে অলআউট হয়। ম্যাচটি হারে ৯৯ রানে।
এর আগে তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত শুরুতে জিম্বাবুয়ে মাত্র ২৪ রানে ৩ উইকেট হারায়। কিন্তু ক্রেইগ আরভিনের ৯৩ এবং ব্রেন্ডন টেলরের ৮১ রানের ইনিংসে ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটি ৮ উইকেটে ২৭১ রান সংগ্রহ করে। তাসকিন ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন।
ম্যাচ শেষে তাসকিনও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, লক্ষ্য তাড়া করার মতো হলেও প্রয়োজনীয় জুটি গড়তে না পারায় বাংলাদেশ ম্যাচ থেকে পিছিয়ে পড়ে।
তবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই একটি ম্যাচের ব্যর্থতাকে শুধু নতুন বল ব্যবহারের নিয়মের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগেই পরিবর্তিত ওয়ানডে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ সামনে রেখে। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে পুরোনো বলের ব্যবহার এবং কন্ডিশন দলগুলোর কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে শেষ ১০ ওভারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে মাঝের ওভারগুলোতে রান তোলার গতি বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে মোস্তাফিজ ও তাসকিনদের বাড়তি সুইংকে উইকেট নেওয়া এবং রান নিয়ন্ত্রণের সাফল্যে রূপ দিতে হবে।
বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ভালো শুরু করা নয়, ইনিংসের শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।





