সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিগুলোর মধ্যে জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন ও জ্বালানি দামের বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি বলছে, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্য ও সেবার কিছু অংশে দামের চাপ এখনো বেশ উঁচুতে রয়েছে।
চলতি ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগস্টের ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সেই লক্ষ্যের চেয়ে ৭৬ ভিত্তি পয়েন্ট বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্য সমন্বয় এবং জাতীয় পে স্কেলের প্রভাব সামনে মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাকে ব্যাহত করতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে পুরো বেতন একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সময়ে কর্মীদের আয় বাড়ার ফলে বাজারে চাহিদার পরিবর্তনও মূল্যস্ফীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি নজরে রাখছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জ্বালানি দামের এই সমন্বয় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে সেই ব্যয়ের প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় মূল্যস্তরেও পড়তে পারে।
অক্টোবরের জন্য অবশ্য নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অক্টোবর মাসেও ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাড়ানো দামই অক্টোবরজুড়ে বহাল থাকছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দুর্বলতা রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কম। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মূল্যস্ফীতি ধীরে কমতে পারে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্য সমন্বয় এবং জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রভাব মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ গতিপথকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।




