এক কেজি আপেল কিনতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, আর মাল্টা কিনতে গেলে তার চেয়েও বেশি খরচ। পরিবারের বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই ফল কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। অথচ ফল শুধু শখের খাবার নয়, শরীরের পুষ্টির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে আমদানি করা ফলের দাম এত বেশি কেন?

এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চ শুল্ক-কর, ডলারের দাম বৃদ্ধি, আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আপেল, কমলা, আঙুর ও এ ধরনের তাজা ফল আমদানি থেকে সরকার প্রায় ৫ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। পাঁচ বছর আগে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এই আয় ছিল ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এই খাত থেকে রাজস্ব আয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ফল আমদানির পরিমাণ কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮ লাখ টন তাজা ফল আমদানি হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে, যা পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২৯ শতাংশ কম। আমদানি কমলেও রাজস্ব আয় বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুল্ক-কর বৃদ্ধির বড় ভূমিকা রয়েছে।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতির মতো আমদানি করা ফলের ওপর মোট শুল্ক-করভার ২০২০-২১ অর্থবছরের ৮৯.৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১২১.৭৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, আমদানি পর্যায়ে ১০০ টাকার পণ্যের বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর প্রায় ১২২ টাকা হতে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন, সংরক্ষণ, ব্যাংকিং ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হয়ে খুচরা বাজারে দাম আরও বাড়ে।

ডলারের দাম বৃদ্ধিও ফলের আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। কমিশনের হিসাবে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২১ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার গড় বিনিময় হার প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বিদেশ থেকে ফল কিনতে আমদানিকারকদের বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

দেশের বাজারে ফলের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি বলেও কমিশনের তুলনামূলক তথ্যে উঠে এসেছে। কমিশনের প্রকাশিত দামের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা, যেখানে ভারতে ১৫০ থেকে ২২০ টাকা এবং পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ টাকা। মাল্টা, কমলা ও আঙুরের ক্ষেত্রেও দামের পার্থক্য রয়েছে। তবে ফলের জাত, মান, আমদানির উৎস এবং খুচরা বিক্রির পর্যায় অনুযায়ী এসব দামে পার্থক্য হতে পারে।

শুধু শুল্ক-কর নয়, বাজারে ফল পৌঁছানোর পথেও খরচ বাড়ছে। কমিশনের বিশ্লেষণে কাস্টমসের শুল্কায়ন মূল্য, সীমিতসংখ্যক আমদানিকারকের ওপর নির্ভরতা, পরিবহন ও বন্দরসংক্রান্ত জটিলতা এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবকে দামের ওপর প্রভাব ফেলা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়েও দামের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফলে আমদানির সময় যে দামে ফল আসে, ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর সময় তার দাম অনেক বেড়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচের সঙ্গে ফলের বাড়তি দাম যোগ হওয়ায় অনেক পরিবার ফল কেনা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের খাবারে ফল রাখার প্রয়োজন থাকলেও দামের কারণে অনেকের পক্ষে তা নিয়মিত কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলের দাম সহনীয় করতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন শুল্ক-কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি ও আনারের মতো ফলের দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই বা খুব সীমিত। তাই এসব ফলের আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগও সীমিত। কমিশন এসব ফলের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে।

কমিশনের ধারণা, শুল্ক কমানো গেলে ফল আমদানি বাড়তে পারে, বাজারে সরবরাহ উন্নত হতে পারে এবং ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে ফল কেনার সুযোগ পেতে পারেন। আমদানির পরিমাণ বাড়লে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে কমিশন পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে শুল্ক কমালেই খুচরা বাজারে দাম নিশ্চিতভাবে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক মুনাফাও দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।

ফলের দাম কমাতে তাই শুধু শুল্ক-কর নয়, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের রাজস্ব আয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা গেলে ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার আরও বেশি মানুষের নাগালে আনা সম্ভব হতে পারে।