নতুন মাস শুরু হতেই রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। অক্টোবরের জন্য ১২ কেজি LPG সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)। নতুন দাম ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু নির্ধারিত দাম বাড়ার আগেই বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, নতুন দামেও তা কাটেনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে The Daily Star জানিয়েছে, ১০ জন খুচরা বিক্রেতার মধ্যে আটজনই বলেছেন, সেপ্টেম্বরের ২০ থেকে ২২ তারিখের পর তারা নতুন LPG সিলিন্ডার পাননি।
যেসব বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডার ছিল, তাদের একজন ১২ কেজির যমুনা LPG ১,৯০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন। আরেকজন ইউনাইটেড আয়গাজের সিলিন্ডারের দাম চেয়েছেন ২,২৫০ টাকা। অর্থাৎ BERC-এর নতুন নির্ধারিত দামের তুলনায় ভোক্তাকে সর্বোচ্চ ৪১৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের অন্য এলাকাতেও পরিস্থিতি একই রকম বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবার কিছু এলাকায় দাম ২,৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অনেক দোকানে আবার গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে BERC বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে LPG-এর দাম বাড়ার কারণেই অক্টোবরে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবরের হিসাব করতে সৌদি আরামকোর প্রোপেনের চুক্তিমূল্য প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার ধরা হয়েছে। এর গড় দাঁড়িয়েছে ৭১২.৫০ ডলার প্রতি টন। পরিবহন ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম এবং গড় ডলার বিনিময় হারও মূল্য নির্ধারণের হিসাবে রাখা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১,৫৮৫ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ১,৮৩৭ টাকা। একই সঙ্গে অন্যান্য ওজনের LPG সিলিন্ডারের দামও প্রতি কেজিতে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা হারে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারের দাম ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে।
তবে বর্তমান বাজার সংকটের কারণ শুধু আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। LPG Operators Association of Bangladesh-এর একাংশ সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগকে দেওয়া চিঠিতে আমদানি করা LPG-এর কিছু চালান আটকে রাখার অভিযোগ তুলে তদন্ত চেয়েছে। তাদের দাবি, আমদানির তথ্য অনুযায়ী মোট সরবরাহে এমন বড় ঘাটতি নেই, যা বর্তমান সংকটকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে।
অন্যদিকে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ১ অক্টোবর বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন LPG আমদানি হয়েছে, যা আগস্টের প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টনের কাছাকাছি। তাদের দাবি, মোট আমদানি ও সরবরাহের পরিমাণ দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে এমন বক্তব্যের মধ্যেই মাঠের চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। অনেক ভোক্তা নির্ধারিত দামে LPG পাচ্ছেন না, আবার কোথাও সিলিন্ডার পেতে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। ফলে BERC-এর নির্ধারিত দাম কার্যকর আছে কি না, সেটিই এখন ভোক্তাদের বড় প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির নির্দেশও এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জেলা প্রশাসকদের LPG বাজার ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
এর আগে সরবরাহ সংকটের সময়ে BERC-এর নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির LPG কিনতে হয়েছে—এমন তথ্যও উঠে এসেছিল। সেপ্টেম্বরে সরকারি দাম ১,৫৮৫ টাকা থাকা অবস্থায় কোথাও কোথাও একটি সিলিন্ডারের দাম ২,২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
ফলে অক্টোবরের নতুন মূল্য নির্ধারণে ভোক্তার জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ শুধু ২৫২ টাকা দাম বাড়া নয়। নির্ধারিত ১,৮৩৭ টাকায় LPG পাওয়া যাবে কি না, নাকি সরবরাহ সংকটের সুযোগে খুচরা বাজারে আরও বেশি দাম দিতে হবে—সেটিই এখন রান্নার গ্যাসের বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সরকারি দাম ও খুচরা বাজারের দামের এই ব্যবধান কমাতে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারি করাই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। অন্যথায় নতুন দাম ঘোষণার পরও সাধারণ ভোক্তার কাছে LPG-এর প্রকৃত খরচ ১,৮৩৭ টাকার মধ্যেই আটকে থাকবে না।



