বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে ধীরগতিতে। গত এক বছরে এ খাতে সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ৫৮০ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবে, ২০২৬ সালের অক্টোবর শেষে দেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২৮ মেগাওয়াটে। অথচ এক বছর আগে এই সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ৭ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথ্যভান্ডারের (National Database of Renewable Energy) তথ্য অনুযায়ী, নতুন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই এসেছে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। বায়ু, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি এখনো খুব সীমিত।

নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বড় ভরসা সৌরশক্তি

২০২৬ সালের অক্টোবর শেষে দেশের মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের পরিমাণ ১ হাজার ৮৩৫ মেগাওয়াট। জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ৬২ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ মেগাওয়াটেরও কম।

এক বছর আগে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ২৫৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এই সময়ে সৌরবিদ্যুতে সক্ষমতা বেড়েছে ৫৭৯ মেগাওয়াট। জলবিদ্যুতের সক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বায়ু ও অন্যান্য উৎসেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সম্প্রসারণ এখনো মূলত সৌরশক্তিনির্ভর।

নীতিগত অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ধীরগতির জন্য আগের সরকারের নীতিগত দুর্বলতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা।

তাঁদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লেটার অব ইনটেন্ট বা প্রাথমিক সম্মতিপত্র বাতিল করে। যেসব প্রকল্প ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের মূল্য পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের পক্ষে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির সুবিধাও বাতিল করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ কমে যায়।

৬ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াটের প্রকল্পেও সাড়া কম

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার ৬ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। কিন্তু দেশি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়েও পর্যাপ্ত আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগে ১১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫২৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে। বাকি প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

নীতিগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিকে অত্যন্ত দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন।

তাঁর মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর না হলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে বাজেট-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের নীতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা গেলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা প্রকাশ করেন মোস্তফা আল মাহমুদ।

সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ

সোলার ইপিসি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এজাজ আল কুদরত এ মাজিদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট উদ্যোগ না নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

এ জন্য অভিজ্ঞ ও সুনামসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় পরিসরে প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা এবং উন্নতমানের সৌর প্যানেল ও সরঞ্জাম আমদানির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তাঁর মতে, শুধু কম দামের সরঞ্জাম আমদানির দিকে নজর দিলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব

বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও দেশের জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। সংস্থাটির সহায়তায় বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৩৮ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে।

এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সম্প্রসারণ জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নয়, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন তদারকি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।