রূপপুরের প্রথম ইউনিটে সব পরীক্ষা শেষ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র
পাবনা প্রতিনিধি
পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই ইউনিটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক পরবর্তী ধাপ ‘সি স্টেজ’ বা পাওয়ার স্টার্টআপে প্রবেশ করতে পারবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান ২৪ অক্টোবর এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের সব পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। গত বুধবার, ২১ অক্টোবর, পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়।
অনুমোদন পেলেই শুরু হবে পরবর্তী ধাপ
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবরের দিকে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে এই কার্যক্রম শুরু করা যাবে কি না, তা নির্ভর করছে বায়েরার চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে প্রবেশের পরও সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে না। শুরুতে সীমিত পর্যায়ে কার্যক্রম চালিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা ও কারিগরি ধাপের ফলাফল যাচাই করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হলে ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এ সময়সীমা নির্ভর করছে পরবর্তী পরীক্ষার সফলতা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।
নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে আগেই
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের অগ্রগতিতে এর আগেও বড় একটি ধাপ অতিক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ৮ অক্টোবর ইউনিটটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয়। পরে ১১ অক্টোবর চুল্লিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
এর আগে চুল্লির স্বয়ংক্রিয় চাপমুক্তকরণ নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি সমস্যা কমিশনিং কার্যক্রমে বিলম্বের কারণ হয়েছিল। রুশ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। এরপরই প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার পর্যায়ে যাওয়ার অনুমোদন মেলে।
তবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এক বিষয় নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডে সংযোগের আগে চুল্লির কার্যক্রম, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
রূপপুর প্রকল্পে রুশ প্রতিনিধিদলের বৈঠক
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ সফর করা রাশিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিনিধিদলটি ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করে। বৈঠকে প্রথম ইউনিটের অগ্রগতি এবং প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট রূপপুর প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা ও নির্মাণকাজে যুক্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
দুই ইউনিটে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটে রাশিয়ার প্রযুক্তিতে তৈরি ভিভিইআর-১২০০ ধরনের দুটি চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট পরিকল্পিত উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। তবে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে নিরাপত্তা যাচাই, পরবর্তী কমিশনিং কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ধারাবাহিকতার ওপর।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বি-২ ধাপের পরীক্ষা শেষ হওয়া রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য বড় অগ্রগতি। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নিশ্চিত নয়। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হওয়ার ওপর।




