চার দিন সারা দেশে গ্যাস থাকবে না, এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খবরটি দেখে অনেক গ্রাহকের মনে প্রশ্ন, রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, সব জায়গায় কি সত্যিই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে? পেট্রোবাংলা বলছে, এ তথ্য সঠিক নয়। তবে উদ্বেগের কারণ একেবারে নেই, এমনটিও নয়। কারণ, একটি বড় এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হতে পারে।
পেট্রোবাংলার ৩ নভেম্বরের বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনালে ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত গ্যাস পুনরায় রূপান্তর বা রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) তরল অবস্থা থেকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় পাইপলাইনে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ওই টার্মিনাল থেকে নির্ধারিত সময়ে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সামিটের টার্মিনাল বন্ধ থাকলে তা কমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ শুধু আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমবে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৩৫ শতাংশ।
তবে পুরো দেশের মোট গ্যাস সরবরাহে এই ঘাটতির অনুপাত ৩৫ শতাংশ নয়। ৩ নভেম্বর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মোট সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামতে পারে। অর্থাৎ মোট সরবরাহ কমার পরিমাণ প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এলএনজি থেকে পাওয়া গ্যাসের সরবরাহ কমার হার এবং দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ কমার হার এক নয়।
বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান আগে থেকেই বড়। পেট্রোবাংলার প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ স্বাভাবিক সরবরাহের হিসাবেও প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। সামিটের টার্মিনাল বন্ধ থাকলে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় বিদ্যমান সংকট বাড়তে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। যেসব এলাকায় আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম, সেখানকার গ্রাহকেরা বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে কোন এলাকায় কতটা চাপ কমবে বা কোন খাতে কতটুকু সরবরাহ কমানো হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক তালিকা পাওয়া যায়নি। তাই সব এলাকায় একই মাত্রার ভোগান্তি হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এদিকে রক্ষণাবেক্ষণকাজের ধরন নিয়ে পেট্রোবাংলা ও সামিটের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলা তাদের বিজ্ঞপ্তিতে কাজটিকে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। অন্যদিকে ২ নভেম্বর সামিট এক বিবৃতিতে জানায়, ৪ থেকে ৭ নভেম্বরের কাজটি জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি; বরং বার্ষিক পরিচালন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সঙ্গে আলোচনা এবং সমন্বয়ের পর কাজের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সামিট আরও জানিয়েছে, টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এলএনজি অবকাঠামোর স্বাভাবিক পরিচালন প্রক্রিয়ার অংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ কাজ শেষ করার মাধ্যমে টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম ও নিরাপত্তা বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য। ফলে কাজটি জরুরি, নাকি পূর্বপরিকল্পিত, তা নিয়ে দুই পক্ষের ভাষায় পার্থক্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ে টার্মিনালের গ্যাস রূপান্তর কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়ে উভয়ের বক্তব্য একই।
মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে সামিট, অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সামিটের টার্মিনাল বন্ধ থাকলেও এক্সিলারেটের টার্মিনাল এবং দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ চলবে। তবে একটি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা অন্য উৎস দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও সামিটের টার্মিনালে একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণকাজ করা হয়েছিল বলে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে। অর্থাৎ টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ নতুন ঘটনা নয়। তবে বর্তমান সময়ে চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় কয়েক দিনের এই বিরতিও গ্রাহকদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ৪ থেকে ৭ নভেম্বর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। তবে সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ কমতে পারে ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকতে পারে। পেট্রোবাংলা এ সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ডে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানিয়েছে।
