রাশিয়া থেকে আসা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম ইউরেনিয়াম জ্বালানির চালান কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শনিবার, ৩ অক্টোবর, পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। সকাল ৭টার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিনটি বিশেষ লরিতে করে চালানটি রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয় এবং দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।

এর আগে শুক্রবার রাত ১১টা ৪৪ মিনিটের দিকে রাশিয়া থেকে আসা বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে করে ইউরেনিয়াম ঢাকায় পৌঁছায়। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা চালানটি গ্রহণ করেন। এরপর নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তা সড়কপথে রূপপুরে পাঠানো হয়।

চালানটির নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট, পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। মহাসড়কে বহরটির নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়; হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও বহরের জন্য সড়কের একটি লেন ফাঁকা রাখার কথা জানানো হয়েছিল।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চালানটি নিরাপদে রূপপুরে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রকল্পের সাইট অফিসের কর্মকর্তা এ বি এম রুহুল কুদ্দুস জানান, সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় লরিগুলো সকাল ৭টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়েছিল এবং দুপুরের দিকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।

কেন এত নিরাপত্তা

পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনে নিরাপত্তা শুধু সড়কে পাহারা দেওয়ার বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিবহনবিধিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্যাকেজের ভেতরে উপাদান নিয়ন্ত্রণ, বাইরে বিকিরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনায় ক্ষতি কমানো এবং জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পারমাণবিক ও অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য আলাদা আন্তর্জাতিক নির্দেশনাও রয়েছে।

রূপপুরের চালানের ক্ষেত্রে তাই বিশেষায়িত পরিবহন ব্যবস্থা, নির্ধারিত রুটে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পাহারা এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু একসঙ্গে রাখা হয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট চালানের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সব operational detail প্রকাশ করা হয়নি; প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিবহনের তথ্যের কিছু অংশকে নিরাপত্তাজনিত কারণে সীমিত রেখেছেন।

দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু

রূপপুর প্রকল্পে দুটি VVER-1200 রিঅ্যাক্টর ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; দুটি ইউনিট চালু হলে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি এবং প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত জ্বালানির জন্য আরও ৪৮টি অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে আনার কথা রয়েছে। এসব জ্বালানি কয়েক দফা কার্গো ফ্লাইটে এনে ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

৩ অক্টোবরের চালানকে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রথম চালান হিসেবে উল্লেখ করেছে একাধিক প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন। তবে একই দিনের বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও কয়েকটি প্রতিবেদনে এটিকে প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত জ্বালানি হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। সরবরাহ পরিকল্পনায় দুই ইউনিটের জন্য আলাদা জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রতিবেদনগুলোর এই বর্ণনায় পার্থক্য দেখা গেছে।

আগের চালান ও রূপপুরের বর্তমান পর্যায়

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জ্বালানির প্রথম চালান বাংলাদেশে এসেছিল ২০২৩ সালে। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে লোড করা হয়। বর্তমানে ইউনিট-১ কমিশনিংয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপের একটি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাইদুল হাসান জানিয়েছেন। পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ ভালভ, নিরাপত্তা ভালভের কার্যক্রম, খোলা-বন্ধ হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অ্যালার্ম ও প্রক্রিয়াগত পরামিতি পরীক্ষা করা হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তুতি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে প্রথম ইউনিট থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহও এগিয়ে নেওয়া হবে।

এদিকে নতুন চালানের আগে নির্ধারিত একটি কার্গো ফ্লাইট ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও তা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় ওই চালান পিছিয়ে যায়। পরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত বলে ব্যাখ্যা করা হয়।

এবারের চালান নিরাপদে রূপপুরে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে নতুন জ্বালানি সরবরাহের কার্যক্রম আবার এগিয়েছে। সামনে থাকা বাকি চালানগুলো নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশে আনা এবং দুই ইউনিটের কমিশনিং ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করাই এখন প্রকল্পের পরবর্তী বড় ধাপ।