দেশের প্রচলিত সিলিং ফ্যানগুলো পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিএলডিসি (BLDC) ফ্যানে পরিবর্তন করা গেলে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) নতুন এক গবেষণায় এ সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক গবেষণাটি তৈরি করেছেন আইইইএফএর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। দেশের ২৬ জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

সাধারণ ফ্যানের অর্ধেক বিদ্যুৎ খরচ বিএলডিসিতে

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত একটি সিলিং ফ্যান সাধারণত ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিএলডিসি প্রযুক্তির ফ্যান চলে প্রায় ৩৫ ওয়াট বিদ্যুতে। অর্থাৎ একই ধরনের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় অর্ধেক হতে পারে।

গবেষণার হিসাবে, বর্তমানে দেশের বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ফ্যানগুলোর মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির। বাকি ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই প্রচলিত বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী নয় এমন ফ্যান।

দেশে বাসাবাড়ি শীতল রাখতে ফ্যানের পেছনে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যয় হয়। সন্ধ্যা থেকে রাতের দিকে, বিশেষ করে রাত ৯টার দিকে ফ্যানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি থাকে।

আইইইএফএর হিসাবে, সব প্রচলিত ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করা গেলে বছরে ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা কমতে পারে ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট

গবেষণায় বলা হয়েছে, ফ্যান পরিবর্তনের মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানো নয়, জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট রাত ৯টায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৯ হাজার ২৭ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের চাপও ছিল।

আইইইএফএর হিসাবে, প্রচলিত ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করা গেলে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভবিষ্যতে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনও এড়ানো যেতে পারে।

আইইইএফএর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চাহিদা কমানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়লে তুলনামূলক দ্রুত বিদ্যুতের চাহিদা কমানো সম্ভব।

দাম বেশি হওয়ায় আগ্রহ থাকলেও কিনছেন না অনেকে

গবেষণায় বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে এর বেশি দাম।

বর্তমানে একটি সাধারণ সিলিং ফ্যানের দাম প্রায় ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৩৫ ওয়াটের বিএলডিসি ফ্যান কিনতে খরচ হয় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। ফলে সাধারণ ফ্যানের তুলনায় এর দাম দুই থেকে তিন গুণ বেশি।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছেন, তাঁরা বাজারে বিএলডিসি ফ্যানের প্রাপ্যতা সম্পর্কে জানেন না। তবে এসব ফ্যানের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুবিধা সম্পর্কে জানানোর পর ৯৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ ধরনের ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল কমানোর সম্ভাবনা থাকলেও প্রাথমিক কেনার খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

গবেষণায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা তার কম। গ্রীষ্মকালে এসব পরিবারের গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৬৬৩ টাকা।

এ ধরনের পরিবারের জন্য বিএলডিসি ফ্যান কেনার বাড়তি খরচ শুধু বিদ্যুৎ বিলের সাশ্রয় থেকে তুলে আনতে ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তবে সরকারিভাবে বেশি পরিমাণে ফ্যান কেনা বা বাল্ক প্রকিউরমেন্ট এবং কার্বন আয় ব্যবহারের মাধ্যমে দাম কমানো গেলে এই সময় প্রায় ৪ দশমিক ৮ বছরে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ অর্থায়ন, কিস্তিতে ফ্যান কেনার সুযোগ এবং ভর্তুকির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

জাতীয় কর্মসূচি চালুর সুপারিশ

বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে আইইইএফএ। এ কর্মসূচির আওতায় একসঙ্গে বেশি ফ্যান কেনার ব্যবস্থা, কম আয়ের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তি পরিশোধের সুযোগ রাখা যেতে পারে।

এ ছাড়া টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) মাধ্যমে ফ্যানের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মান ও লেবেলিং ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ক্রেতারা সহজেই কোন ফ্যান কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে, তা বুঝতে পারবেন।

পুরোনো ফ্যান পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন, নতুন ফ্যানের মান নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে গবেষণায়।

বাস্তবায়ন হলে লাভবান হতে পারে বিদ্যুৎ খাত ও গ্রাহক

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। চাহিদা সামাল দিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও জ্বালানি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এ অবস্থায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিল কমবে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।

তবে গবেষণায় উল্লেখ করা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় এখনই অর্জিত কোনো অর্থ নয়। এটি দেশের প্রচলিত ফ্যানগুলো পর্যায়ক্রমে বিএলডিসি ফ্যানে পরিবর্তন করার ভিত্তিতে করা সম্ভাব্য হিসাব। এ সুবিধা বাস্তবে পেতে হলে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, সরকারি সহায়তা, সাশ্রয়ী দামে ফ্যান সরবরাহ এবং কার্যকর জাতীয় কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে।