রূপপুরে প্রথম নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া শুরু, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরেক ধাপ

পাবনা, ১২ অক্টোবর ২০২৬: বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত কেন্দ্রটির রিঅ্যাক্টর প্রথমবারের মতো ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করেছে প্রকল্পটি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কমিশনিং দলের সদস্যরা রোববার প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরিমাপক নকশা অনুযায়ী কাজ করছিল।

কী ঘটেছে রিঅ্যাক্টরে

নিউক্লিয়ার ফিশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে তুলনামূলক ছোট নিউক্লিয়াস তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই তাপ কাজে লাগিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করে।

রিঅ্যাক্টরের ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জনের অর্থ হলো, নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে একটি বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন নিউট্রন পরবর্তী বিক্রিয়াগুলো চালিয়ে যেতে পারে। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছানো মানেই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে যাওয়া নয়। এর পরও রিঅ্যাক্টরের স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় যাচাই করতে হয়।

গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে এখনো বাকি অনুমোদন

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরুর আগে ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেয়। এর ফলে রিঅ্যাক্টরকে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার পর্যায়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়।

বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানিয়েছিলেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, প্রথম বিক্রিয়া শুরু হলেও কেন্দ্রটিকে গ্রিডে যুক্ত করার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরামিতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরাপত্তা ভালভের সমস্যার পর অগ্রগতি

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পেতে স্বয়ংক্রিয় চাপমুক্তকরণ ভালভের কারিগরি সমস্যা সমাধান করতে হয়েছিল। কমিশনিং পরীক্ষার সময় এই ব্যবস্থার দুটি ভালভ প্রত্যাশামতো কাজ না করায় প্রক্রিয়াটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের একটি দল কেন্দ্রটিতে এসে প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভালভগুলোর পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রথম বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয়।

এই অগ্রগতির মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির কমিশনিং কার্যক্রম আরও এগিয়েছে। তবে পরবর্তী পরীক্ষা ও অনুমোদনের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে কেন্দ্রটি কখন এবং কী পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে।

দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটই পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে; নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

প্রথম ইউনিটে নিউক্লিয়ার ফিশন শুরু হওয়ায় এখন মূল নজর থাকবে রিঅ্যাক্টরের স্থিতিশীলতা যাচাই, কমিশনিংয়ের পরবর্তী পরীক্ষা এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগের অনুমোদনের দিকে। এসব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলেই রূপপুর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ খুলবে।