১১৪ বছর আগের রবীন্দ্রনাথের চিঠি প্রকাশ করল নোবেল কর্তৃপক্ষ
বিনোদন ও সংস্কৃতি ডেস্ক
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে লেখা ১১৪ বছরের পুরোনো একটি চিঠি প্রকাশ করেছে নোবেল পুরস্কারের কর্তৃপক্ষ। ১৯১২ সালের ১৩ অক্টোবর ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলকে লেখা এই চিঠিতে ধর্ম, উপনিষদ এবং মানুষের অসীম সত্তার উপলব্ধি নিয়ে নিজের দর্শন তুলে ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিঠিটি বর্তমানে কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ট্রান্ড রাসেল আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে।
১৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে চিঠিটির ছবি শেয়ার করা হয়েছে। এতে দুই নোবেলজয়ী মনীষীর মধ্যে হওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগের একটি ঐতিহাসিক দলিল নতুন করে সামনে এসেছে।
চিঠিতে কী লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
১৯১২ সালের ওই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানান, রাসেলের ‘দ্য এসেন্স অব রিলিজিয়ন’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ তিনি সম্প্রতি পড়েছেন। প্রবন্ধটি তাঁকে উপনিষদের একটি শ্লোকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। এরপর চিঠিতে শ্লোকটি রোমান হরফে লিখে তার ইংরেজি অনুবাদও তুলে ধরেন কবিগুরু।
শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো, অসীম ব্রহ্মকে কেবল বুদ্ধি বা ভাষার সাহায্যে পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। কিন্তু মানুষের সীমাবদ্ধ আত্মসত্তার গণ্ডি পেরিয়ে অসীমের আনন্দ উপলব্ধি করতে পারলে সে ভয় থেকে মুক্ত হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে ব্যাখ্যা করেন, এই উপলব্ধি কোনো কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মবিশ্বাস নয়। বরং সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতার বন্ধন ভেঙে নিজের ইচ্ছা ও ভালোবাসাকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে অসীমের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করা সম্ভব।
ইংল্যান্ড সফরে পরিচয় দুই মনীষীর
১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড সফরের সময় বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁদের মধ্যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদানেরও প্রমাণ রয়েছে। ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে রবীন্দ্রনাথের লেখা একাধিক চিঠির নথি সংরক্ষিত আছে।
রাসেলকে লেখা ১৩ অক্টোবরের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গও তোলেন। ওই সময় শীল ইংল্যান্ড সফরে ছিলেন। চিঠির বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়, দুই চিন্তাবিদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দর্শন ও পারস্পরিক পরিচিতজনের ভূমিকা ছিল।
একই বিষয়ে দুই নোবেলজয়ীর ভিন্ন চিন্তা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর ইংরেজিতে অনূদিত কবিতা ও কাব্যচিন্তা পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায়। অন্যদিকে, বার্ট্রান্ড রাসেল ১৯৫০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর লেখায় দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, সমাজ ও মানবজীবনের নানা বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
দুজনই সাহিত্যে নোবেলজয়ী হলেও তাঁদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি এক ছিল না। ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে রাসেল রবীন্দ্রনাথের কিছু দার্শনিক ধারণার সঙ্গে নিজের মতপার্থক্যের কথাও লিখেছিলেন। ফলে ১৯১২ সালের চিঠিটি কেবল দুই বিখ্যাত ব্যক্তির যোগাযোগের স্মারক নয়, তাঁদের চিন্তার জগৎ বোঝারও একটি ঐতিহাসিক উপাদান।
কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে চিঠিটি
চিঠিটি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টনে অবস্থিত ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ট্রান্ড রাসেল আর্কাইভের সংগ্রহের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়টির আর্কাইভে রাসেলের চিঠি, পাণ্ডুলিপি, আলোকচিত্র এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহের বহু নথি রয়েছে। গবেষক ও ইতিহাসবিদেরা এসব নথির সাহায্যে বিংশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিন্তা ও পারস্পরিক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করেন।
রবীন্দ্রনাথের এই চিঠির পূর্ণ বিবরণ ও প্রতিলিপি ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিয়ার বার্টি’ আর্কাইভের ওয়েবসাইটেও দেখা যায়। সেখানে চিঠির তারিখ, মূল লেখা এবং উপনিষদের শ্লোকসংক্রান্ত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে লেখা চিঠিটি তাই শুধু রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত পত্রালাপের নিদর্শন নয়। ধর্ম, দর্শন ও মানুষের আত্মিক মুক্তি নিয়ে তাঁর ভাবনার একটি প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবেও এটি পাঠক ও গবেষকদের কাছে মূল্যবান।

