আলোকচিত্র ইতিহাসের সাক্ষী, সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার
ঢাকা, ১১ অক্টোবর: একটি আলোকচিত্র শুধু কোনো মুহূর্তকে ধরে রাখে না, বরং সমাজের অন্যায়, মানুষের প্রতিবাদ, দুর্ভোগ ও সংগ্রামের এমন বাস্তব চিত্র সামনে আনে, যা জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। ফটোসাংবাদিকতার এই শক্তির কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, আলোকচিত্র ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী এবং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ঢাকায় বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজেএ) কার্যালয়ে সংগঠনটির সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় কাদের গনি চৌধুরী ফটোসাংবাদিকদের পেশাগত অবদান, ইতিহাস সংরক্ষণে তাঁদের ভূমিকা এবং কাজের যথাযথ স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
একটি ছবিই তুলে ধরতে পারে মানুষের সংগ্রাম
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ছবি কোনো কথা না বলেও মানুষের আবেগ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও মানবিকতার গভীর বার্তা প্রকাশ করতে পারে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শোষণ ও মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে ফটোসাংবাদিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাঁর মতে, একটি ছবি ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। কখনো তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রেরণা জোগায়, আবার কখনো মানুষের সামনে এমন বাস্তবতা তুলে ধরে, যা আগে তাদের নজরে আসেনি।
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ছবির উদাহরণ
আলোকচিত্রের প্রভাব বোঝাতে কাদের গনি চৌধুরী আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত কয়েকটি ছবির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর তুরস্কের সৈকতে তিন বছর বয়সী সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির নিথর দেহ পড়ে থাকার ছবি বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট ও যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়কে সামনে নিয়ে আসে।
১৯৯৩ সালে দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি শিশুর পেছনে শকুন অপেক্ষা করছে—এমন একটি ছবিও ক্ষুধা ও মানবিক সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরেছিল। ছবিটি তোলার জন্য কানাডীয় আলোকচিত্রী কেভিন কার্টার পরবর্তী সময়ে পুলিৎজার পুরস্কার পান।
বাংলাদেশের ইতিহাস সংরক্ষণেও আলোকচিত্রের ভূমিকা
বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সংরক্ষণে ফটোসাংবাদিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন কাদের গনি চৌধুরী। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের নানা মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করে তাঁরা ইতিহাসের দলিল তৈরি করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাসন্তী ও দুর্গা নামের দুই নারীর শরীরে মাছ ধরার জাল জড়ানো ছবি এবং ক্ষুধার্ত মানুষের দুর্দশার দৃশ্যও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আলোচনায় এসেছিল। একইভাবে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি সীমান্তে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছিল।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে আলোকচিত্রীর আমানুল হকের তোলা ছবির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো আড়াল করার চেষ্টা সত্ত্বেও এসব ছবি ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে টিকে রয়েছে।
ফটোসাংবাদিকতা সংবাদমাধ্যমের অপরিহার্য অংশ
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্রে আলোকচিত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার মাধ্যমে সংবাদ ও তথ্য তুলে ধরা হয়, আর ছবি সেই ঘটনাকে পাঠকের সামনে দৃশ্যমান করে তোলে। তাই ফটোসাংবাদিকতাকে সাংবাদিকতার গৌণ কোনো শাখা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ফটোসাংবাদিক আহত হয়েছেন, কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁদের কাজের ঝুঁকি ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়লেও রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশি আলোকচিত্রীদের আন্তর্জাতিক অর্জনের প্রশংসা করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, দেশের ফটোসাংবাদিকেরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও সম্মাননায় সাফল্য অর্জন করছেন। ২০১৮ সালে রয়টার্সের ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ পনির হোসেন পুলিৎজার পুরস্কার পান। বাংলাদেশের আলোকচিত্রীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
দেশের আলোকচিত্রীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো আলোকচিত্রী স্বাধীনতা পদক পাননি। তবে একুশে পদক ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক পেয়েছেন একাধিক আলোকচিত্রী।
ফটোসাংবাদিকদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের ধারণ করা ছবির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীতের সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানবিক সংকট সম্পর্কে জানতে পারবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব আলোকচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মহসিনের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বাবুল তালুকদার। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রফিকুর রহমান ও বুলবুল আহমেদসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।

