রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। রোববার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
আহত সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন দ্য ডেইলি স্টারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, bdnews24.com-এর আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু। তাদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়; পরে কয়েকজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট থেকে একটি মিছিল নিয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে যান। সেখানে হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামকে মারধরের উদ্দেশ্যে তারা এসেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই দলের কয়েকজনের হাতে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটের মতো দেশীয় অস্ত্র ছিল। সাংবাদিকেরা ঘটনাটি ধারণ করতে গেলে তাদের ওপর হামলা হয় এবং কয়েকজনকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য তিনি তাদের হলের ভেতরে নিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে এসেছে। প্রক্টর পরে স্বীকার করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
প্রক্টরের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও তারা পরিস্থিতির কারণে সরে যায়। তবে পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
হামলার পর সাংবাদিকেরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সোমবারের মধ্যে মামলা করার আশ্বাস দিলে রোববার রাতে তাদের তাৎক্ষণিক কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তবে অন্যান্য দাবিতে তারা অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন।
সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে সাংবাদিকেরা মানববন্ধনও করেন। তাদের অভিযোগ, হামলার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
এর মধ্যেই হামলার অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কমিটিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল ও মনজুরুল আলম রিয়াদকে রাখা হয়েছে। তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের নির্দেশে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংগঠনটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাটিকে ক্যাম্পাসের একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগের যথাযথ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেছেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলকে জানানো হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েকজন নেতার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হামলার সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্যও সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিকে হামলার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেছে। ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি উঠেছে।
সোমবার দিনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রদলের তদন্ত কমিটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে এখন হামলার অভিযোগের তদন্ত, আইনগত পদক্ষেপ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা—এই তিন দিকেই নজর থাকবে।


