নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্যও ছিল খাবার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে পশু জবাই বন্ধে প্রশাসনের নির্দেশনার প্রতিবাদে গরুর মাংস ও খিচুড়ি বিতরণের আয়োজন করেছেন শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চলে প্রায় এক ঘণ্টা। আয়োজকদের ভাষ্য, অনলাইনে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য গরুর মাংসের পরিবর্তে ছাগলের মাংসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

এর আগে বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনেন। শুক্রবার সকালে উপাচার্যের বাসভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে গরুটি জবাই করা হয়। পরে ক্যাফেটেরিয়ায় ছয়টি বুথের মাধ্যমে খাবার বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা জানান, ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধের নির্দেশনার প্রতিবাদ জানাতেই তাঁদের এই আয়োজন।

কেন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

ঘটনার সূত্রপাত ১২ অক্টোবর রাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা স্নাতক সম্মান শেষ করার আনন্দে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। ওই স্থানের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির অবস্থিত।

রান্নার আয়োজনকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন একদল শিক্ষার্থী। আয়োজক শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাঁরা কাঠের চুলা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। পরে ব্যবহৃত ইটগুলো মন্দিরের বলে জানতে পেরে সেগুলো সরিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে লোহার চুলা নিয়ে আসেন বলে তাঁদের দাবি। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাঁরা দুঃখ প্রকাশও করেন।

১৪ অক্টোবর পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা

এ ঘটনার পর ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের এক বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নির্দেশনাটি প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনের নেতারা এটিকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। তাঁদের বক্তব্য, খাবারের পছন্দ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত নয়। এর পরই শুক্রবার গরুভোজের কর্মসূচি সামনে আসে।

প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই কি আয়োজন

নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে কর্মসূচি আয়োজন করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক মো. আজম খান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয় এবং শিক্ষার্থীরা অনুমতি চাইলে প্রশাসন মৌখিক সম্মতি দেয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আয়োজনটি সম্পন্ন করার বিষয়েও শর্ত ছিল বলে তিনি জানান। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিটি শুধু নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর আগে তৈরি হওয়া বিরোধ মেটাতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছিল। তবে ক্যাম্পাসে পশু জবাইয়ের নিয়ম, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও নিয়মের প্রশ্ন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি একদিকে শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে এনেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান এবং ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেন। ফলে কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে এক পক্ষের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি অন্য পক্ষের অনুভূতি, নিরাপত্তা ও পরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য, প্রয়োগের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

শুক্রবারের গরুভোজ শেষ হলেও ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে খাবার বিতরণ, পশু জবাই কিংবা বড় আকারের শিক্ষার্থী আয়োজনের জন্য কী ধরনের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে একই ধরনের বিরোধ এড়ানো সহজ হতে পারে।