নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার। ধান সংরক্ষণের জন্য ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার এই সাইলো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের আগ্রহে। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নযোগ্যতা ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় শেষ পর্যন্ত এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন ওই জমিতে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম বা সিএসডি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নে সাইলো নির্মাণের জন্য প্রায় ১৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। জমিটি মূলত আবাদি কৃষিজমি ছিল। অধিগ্রহণের পর মাটি ভরাটের কাজও করা হয়। কিন্তু প্রায় আড়াই বছর ধরে জায়গাটি কার্যত খালি পড়ে রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেখানে সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা আর থাকছে না।

সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আগ্রহে ২০২৩ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬৭ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটি বাতিলের আগে জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের মতো প্রাথমিক কাজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ এগোয়নি।

গত মঙ্গলবার পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বলা হয়, স্টিল সাইলোতে সাধারণত নৌপথ বা রেলপথে বাল্ক পদ্ধতিতে খাদ্যশস্য পরিবহন করা হয়। কিন্তু মহাদেবপুরের নির্ধারিত স্থানে নৌপথ বা রেলপথের সুবিধা নেই। ফলে সড়কপথে খাদ্যশস্য পরিবহন করতে হলে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

স্থানীয় নদীপথের দূরত্বও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। প্রকল্প এলাকা থেকে আত্রাই নদের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং ছোট যমুনা নদীর দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এত দূর থেকে খাদ্যশস্য পরিবহন করে সাইলোতে নেওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, ওই স্থানে স্টিল সাইলো নির্মাণ কার্যকর হবে না। বস্তা ছাড়া চাল সরবরাহের সুযোগ নেই এবং সড়কপথে পরিবহনের কারণে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। তাই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম বা সিএসডি নির্মাণ করা হতে পারে।

তবে নওগাঁয় খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য বিদ্যমান গুদামগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০টি খাদ্যগুদাম রয়েছে, যেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪১ হাজার ৫০০ টন। প্রয়োজনে এসব গুদামে ধারণক্ষমতার তুলনায় আরও ৩০ শতাংশ বেশি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নওগাঁয় উৎপাদিত খাদ্যশস্যের একটি অংশ সরকারি কর্মসূচির আওতায় অন্যান্য জেলায় পাঠানো হয়। তাই নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগে প্রকৃত প্রয়োজন ও পরিবহনব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অধিগ্রহণ করা জমি খালি না রেখে সেখানে বিকল্প স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ওই স্থানে ১ হাজার টন ধারণক্ষমতার ২৫টি গুদাম নির্মাণ করা সম্ভব। এতে মোট ২৫ হাজার টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যাবে।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুল্লাহ আল ইমরান মনে করেন, সেখানে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে সমীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে স্থাপনাটির প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বর্তমানে কারাগারে থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সব মিলিয়ে ৩৬৭ কোটি টাকার সাইলো প্রকল্প বাতিলের পর এখন মূল প্রশ্ন, অধিগ্রহণ করা ১৫ একর জমি কীভাবে কাজে লাগানো হবে। সেখানে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম নির্মাণের প্রস্তাব থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করে বড় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিলে সরকারি অর্থ ও জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।