সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে কোভিড-১৯ মোকাবিলার একটি প্রকল্পে অনিয়ম, জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২১ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান ঢাকায় কমিশনের কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ (ইআরপিপি) প্রকল্পের ছয়টি ক্রয় প্যাকেজে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। এসব ঘটনায় মোট ১২ কোটি ৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাগুলোর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কেএন৯৫ ও এন৯৫ মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হাসপাতালের বেড, চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন এবং মোবাইল ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি ও সেবার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম। দুদকের দাবি, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
ছয় মামলায় যে অর্থের অভিযোগ
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম মামলায় অভিযোগের অর্থ ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাছাকাছি। দ্বিতীয় মামলায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, তৃতীয় মামলায় ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকার কাছাকাছি এবং চতুর্থ মামলায় ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭০ টাকার অভিযোগ রয়েছে।
পঞ্চম মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে ২ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৫ টাকা আত্মসাতের। ষষ্ঠ মামলায় অভিযোগের অর্থ ৩ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ছয়টি মামলার অর্থ যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
যারা আসামি
জাহিদ মালেকের পাশাপাশি মামলাগুলোতে ইআরপিপি প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবির, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. সানিয়া তাহমিনা ঝোরা এবং অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন প্যাকেজে পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তারাও মামলার আসামি।
দ্য নিউ নেশন-এর প্রতিবেদনে ১৩ আসামির নামের মধ্যে আরও রয়েছেন ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডা. মো. আনোয়ার সাদাত, ডা. অনির্বাণ সরকার, জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক কাজী শামীমুজ্জামান, ই-মিউজিকের মালিক হোসনি ইব্রাহিম, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের মালিক রইসুল কবির, ইনশা ট্রেড করপোরেশনের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সিম করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা অংশীদার মোস্তফা মনোয়ার এবং এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের মালিক সাইফুর রহমান।
কোন প্যাকেজে কী অভিযোগ
প্রথম মামলায় কেএন৯৫ ও এন৯৫ মাস্ক এবং হ্যান্ড গ্লাভস কেনার প্যাকেজে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলাটি হাসপাতালের বৈদ্যুতিক বেড কেনার প্যাকেজে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে।
তৃতীয় মামলায় কেএন৯৫ মাস্ক কেনায় প্রায় ৯৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। চতুর্থ মামলায় জনসচেতনতামূলক টেলিভিশন বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার জন্য প্রায় ৬২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
পঞ্চম মামলায় চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য কেনায় প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং ষষ্ঠ মামলায় কোভিড-১৯–সংক্রান্ত মোবাইল ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন সেবায় প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
মামলার ভিত্তি
দুদক জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এসব মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোতে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১২০(বি) ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ইআরপিপি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে একই প্রকল্পের কেনাকাটায় আরও বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছিল; তবে বর্তমান ছয় মামলার অভিযোগের অর্থ ১২ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং এগুলো দুদকের পৃথক তদন্তের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত মামলার এই পর্যায়ে বলা যাচ্ছে না; আদালতে প্রত্যেক আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে।
