বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক দিন আগেই আসন আটকে রাখার সুযোগ, প্রশাসনিক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার এবং টিকিট কালোবাজারির আশঙ্কা উঠে এসেছে আইটি অডিটে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রেলের সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে করা নিরীক্ষায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া টিকিট বিক্রির আয়, সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা আদায় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকেরা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, অডিটের পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, সহজ জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছে। তবে অডিটে উঠে আসা অভিযোগগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

টিকিট ছাড়ার আগেই আসন আটকে রাখার সুযোগ

রেলওয়ের অডিটে বলা হয়েছে, সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থার অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত করার আগেই নির্দিষ্ট আসন ব্লক করে রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থায় টিকিটিং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও রেলওয়ের বুকিং সহকারীদের ভূমিকা কী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আজকের পত্রিকার ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে অডিটের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, চট্টগ্রাম ও সিলেট স্টেশনে এ ধরনের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম স্টেশনের ড্যাশবোর্ডে ২৭ জুলাই কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেসের ১১ আগস্টের একটি আসন সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কোটা থেকে সরিয়ে শুধু কাউন্টারে বিক্রির উপযোগী কোটায় ব্লক করা দেখা যায়।

নিয়ম অনুযায়ী, ওই যাত্রার টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য ১ আগস্ট সকাল ৮টায় অনলাইনে ছাড়ার কথা ছিল। অর্থাৎ, অডিটে দেখা উদাহরণ অনুযায়ী, যাত্রার নির্ধারিত টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই আসনটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছিল।

অডিটের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, টিকিট ছাড়ার ঠিক আগে আসনগুলো অনলাইন বিক্রির জন্য অনুপলব্ধ করে রাখলে পরে বুকিং সহকারীদের মাধ্যমে সেগুলো সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সাধারণ যাত্রীরা অনলাইনে টিকিট খুঁজতে গিয়ে আসন বিক্রি হয়ে গেছে বা বুকড রয়েছে বলে দেখতে পারেন।

তবে এ ধরনের সুযোগ থাকার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনিয়ম হয়েছে। কারা কোন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন, কী উদ্দেশ্যে আসন আটকে রাখা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কালোবাজারির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন

রেলের টিকিটিং ব্যবস্থায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট সহজের কর্মীদের পরিচালনায় থাকার তথ্য অডিটে উঠে এসেছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আসন ব্লক ও উন্মুক্ত করা, কোটা পরিবর্তন এবং টিকিটিং ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করার সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিটের মূল উদ্বেগ হলো, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের সীমা এবং টিকিট বিক্রির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল কি না। অ্যাকাউন্টগুলোর কার্যক্রম যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা না গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলেও নিরীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। টিকিট ব্লক করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আগাম আসন আটকে পরে বেশি দামে বিক্রি করেছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ অভিযোগের দায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চূড়ান্তভাবে চাপানোর আগে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

বট ব্যবহার করে টিকিট আটকে রাখার অভিযোগ

অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পরপরই অনেক আসন শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। ঢাকা পোস্টের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে বলা হয়, bookmyrailbd.com নামের একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক টিকিট আটকে রেখে পরে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

নথিতে এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে টিকিটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিগত দায়িত্বের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাবও ছিল।

তবে বট ব্যবহারের অভিযোগ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। অননুমোদিত ওয়েবসাইটটির কার্যক্রমের সঙ্গে কারা জড়িত, টিকিটগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কোনো অভ্যন্তরীণ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও যাচাই প্রয়োজন।

২২টি অডিট আপত্তি, জরিমানা আদায় নিয়েও প্রশ্ন

টিকিট ব্লক করার সুযোগই একমাত্র উদ্বেগ নয়। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে করা অডিটে একাধিক আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত অসংগতি চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকা পোস্ট ও আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে ২২টি অডিট মেমো পাঠানো হয়। এসব পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অডিটে অনলাইন টিকিট বিক্রির আয় অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি, সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকা এবং অন্যান্য ত্রুটির কারণে সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনেও জরিমানা আদায় ও টিকিটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে অডিটের পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রেলওয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের কিছু জরিমানা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া পাওনার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। ফলে জরিমানার হিসাব, আদায়ের পদ্ধতি এবং সরকারি অর্থের হিসাব চূড়ান্তভাবে মেলানো প্রয়োজন।

যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

অনলাইন টিকিট ব্যবস্থায় যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও অডিটে গুরুত্ব পেয়েছে। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল তথ্যভান্ডার বিদেশে ক্লাউড অবকাঠামোয় সংরক্ষিত থাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হলে যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে নিরীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এসব তথ্যের মধ্যে নাম, মোবাইল ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ইমেইল, ভ্রমণের ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য থাকতে পারে। তবে তথ্য চুরি হয়েছে, এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ ওই পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এখানে মূল বিষয় হলো, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি রয়েছে।

রেলওয়ের বক্তব্য ও সহজের জবাব

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, অডিটে সহজের বিষয়ে যেমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে, তেমনি রেলওয়ের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সহজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, অডিটের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় জবাব ও সহায়ক নথি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো চুক্তির শর্ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় পর্যালোচনা চলাকালে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, যাত্রীসেবা, তথ্যের নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে রেলওয়ে, আসছে নতুন এজেন্সি

অভিযোগ পর্যালোচনার পাশাপাশি টিকিটিং ব্যবস্থার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি স্টেশনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা প্রশাসনিক সুবিধা রেলওয়ের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে কোচ যুক্ত বা বাদ দেওয়া এবং আসনের তথ্য হালনাগাদের মতো কাজ রয়েছে।

একই সঙ্গে বর্তমান ঠিকাদারি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন টিকিটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তিটি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা। নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে চলমান অভিযোগগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা রেলওয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।

এখন নজর তদন্ত ও জবাবদিহিতে

অনলাইনে টিকিট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আসন শেষ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ। অডিটে উঠে আসা পর্যবেক্ষণগুলো তাই শুধু টিকিট বিক্রির প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং যাত্রীদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে এনেছে।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২২টি অডিট আপত্তির প্রতিটির জবাব যাচাই করে রেলওয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টগুলোর ব্যবহার, আগাম আসন আটকে রাখার ঘটনা, সম্ভাব্য কালোবাজারি এবং জরিমানার হিসাবের বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের ফল প্রকাশ করা গেলে যাত্রীদের আস্থা ফেরানোর পথ তৈরি হতে পারে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকিটিং ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা জরুরি। আর তদন্তে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবস্থানও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।